বাসস
  ০৩ জুন ২০২৬, ১১:৫৫
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ১২:২৫

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বৈঠা হাতে জীবন যুদ্ধে তাসলিমা

নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৭৮ বছর বয়সী সংগ্রামী নারী তাসলিমা। ছবি: বাসস

শরীয়তপুর, ৩ জুন, ২০২৬ (বাসস) : আড়াই দশক আগে স্বামীর মৃত্যুর পর ৪ শিশু সন্তানদের নিয়ে অথই সাগরে পড়েন তাসলিমা বেগম। বাধ্য হয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া নৌকার বৈঠা হাতে তুলে হয়ে যান খেয়া ঘাটের মাঝি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নৌকা চালিয়ে মেঘনার শাখা নদীর এপার থেকে ওপারে মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। নিজের থাকার জায়গা নেই তাসলিমার। অন্যের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করেন। প্রতিদিন গনগনে রোদ-ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে খেয়া নৌকা চালাতে হয় তাকে। ২৫ বছরেও অধিক সময় অবধি নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৭৮ বছর বয়সী এই সংগ্রামী নারী।

তাসলিমা বেগমের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়া এলাকায়। ঐ ইউনিয়নের পাশে মেঘনা নদী। বিভিন্ন সময় চর পড়ে সেখানে একটি শাখা নদী তৈরি হয়েছে। সে নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাসলিমার স্বামী নাসির সরদার। চার শিশু সন্তানকে রেখে ২৬ বছর আগে তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর শিশু সন্তানদের খাবার জোগাড় করতে স্বামীর নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন তাসলিমা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোদালপুর মূলত কৃষি ও মৎস্য প্রধান চরাঞ্চল। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রয়োজনের তাগিদে অন্য কোথাও যেতে
বাসিন্দাদের নৌকা দিয়ে মেঘনার শাখা নদী পার হতে হয়। ২০০১ সালে হাজীপাড়া এলাকায় একটি খেয়াঘাট তৈরি করে দেয় কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদ। সেই খেয়াঘাটে নৌকায় মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার শুরু করেন তাসলিমা।

তবে নৌকা দিয়ে মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার করে সামান্য কিছু নগদ টাকা পান আর নদী পারাপারের বিনিময়ে গ্রামের বাসিন্দারা ফসলের মৌসুমে তাসলিমাকে বিভিন্ন ফসল দেন। সেই ফসল বিক্রি করে কোনরকম সংসারের খরচ চালান তিনি। নৌকা চালানোর আয় দিয়ে তাসলিমার জীবন মোটামুটি চলছিল। এভাবে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পাঁচ বছর আগে বিপদ নেমে আসে সংসারে। ছেলে আলী আকবর নৌ দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যান। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তাসলিমা। সে ছেলে খেয়াঘাটের পাশেই একটি ছোট্ট চায়ের দোকান পরিচালনা করেন।

খেয়াঘাটের পাশে বাউল কান্দির ওসমান দেওয়ান প্রতিদিন নানা কাজে খেয়া নৌকায় এপার-ওপার যাওয়া-আসা করেন । তিনি বলেন, তাসলিমা বেগম দীর্ঘ ২৫ বছরেরও অধিক সময় ধরে খেয়াঘাটের মাঝির কাজ করে আসছেন। এ ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। এখন সে বয়সের ভারে নুব্জ্য। তাকে পুনর্ব সন করা দরকার।

তাসলিমার বড় মেয়ে ফাহিমা বলেন, ‘আমাদের শিশু অবস্থায় বাবা মারা গেছে। তারপর থেকে মা অনেক কষ্ট সহ্য করে আমাদের আগলে রেখেছেন। তিনি বৈঠা হাতে নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন। এখনো তার হাতে বৈঠা। এখনো দিন-রাত সংগ্রাম করে চলছেন। দারিদ্র্যতার কারণে ইচ্ছে থাকার পরও মায়ের খোঁজ রাখতে পারি না।

তাসলিমা বেগমের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। ছবি তুলতে চাইলে বাঁধা দেন। কারণ, জানতে চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে ‘বলেন, অনেকে এ রকম কথা বলছে, অনেকের কাছে দুঃখ দুর্দশার কথা জানিয়েছি। কথা শুনে, ছবি তুলে সবাই চলে গেছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নতুন করে আর কিছু বলার ইচ্ছে নেই। স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ি। তখন মাথায় আসে, স্বামীর রেখে যাওয়া নৌকাই আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন হবে। ২৫ বছর ধরে নদীর একূল থেকে ওকূলে নৌকায় জীবন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সরকারি সহায়তা বলতে বিধবা ভাতা পাই। বড় আশা ছিল, সন্তানদের বসবাসের জন্য আর নিজের কবরের জন্য এক টুকরা জমি হবে। কিন্তু সে আশা পূরণ হলো না। অন্যের জমিতে ঘর বেঁধেছি। যখন ছেড়ে দিতে বলবে, তখন ছেড়ে দিতে হবে। এতদিনে বেঁচে থাকার অবলম্বন নৌকাটার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নতুন নৌকা তৈরি করতে ব্র্যাক এনজিও থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ তুলেছি। ঋণ পরিশোধ কিভাবে করবো সে চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না। মাসে ১০ হাজার টাকা কিস্তি । ঋণের কিস্তি দেয়ার চিন্তায় আছি। যতবারই নৌকা ভেঙেছে ততবারই ঋণ তুলে নতুন নৌকা তৈরি করেছি। আর পারছিনা। একমাত্র ছেলে নৌ-দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে গেছে। তিন মেয়েকে কোন রকম বিয়ে-শাদী দিয়েছি। একজনের জামাই ইতোমধ্যেই মারা গেছে। দুইজনের জামাই কোন রকম দিন আনে দিন খায়। কেউ কোন সাহায্য সহযোগিতা দেয়নি। নদীই এখন আমার বেঁচে থাকার ঠিকানা।’

বিষয়টি নিয়ে কোদালপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার দাদন ভুঁইয়া বলেন, তাসলিমা বেগম দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ খেয়াঘাটে যাত্রী পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। বয়সের কারণে সে কর্মক্ষম হয়ে গেছে। আমরা অনেক চেষ্টা করে তাঁর কিছু করতে পারিনি। তাঁকে সরকারিভাবে দ্রুত পুনর্বাসনের আহ্বান জানাচ্ছি।

কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের তাগিদে নৌকা চালানো শুরু করেন। এলাকার মানুষ তাকে ধান-চালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দেন। তাতে তার সংসার চলেনা। তারা বিভিন্ন সময় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সহায়তা করেন। তিনি যে ঘাটে নৌকা চালান, সেখানকার ইজারা মওকুফ করা হয়েছে। তিনি যাতে একটি খাস জমি বরাদ্দ পেতে পারেন, সে উদ্যোগ নেয়া হবে।

গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুশরাত আরা খানম বাসস’কে বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি জেনেছি। বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়ে তাঁকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা হবে।