বাসস
  ০৩ জুন ২০২৬, ১১:২৬

হাবিপ্রবি’র গার্ডেনে বিলুপ্ত প্রায় বাওবাব গাছ সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে

হাবিপ্রবি'র বোটানিক্যাল গার্ডেনে বিলুপ্ত প্রায় বাওবাব গাছ । ছবি : বাসস

দিনাজপুর, ৩ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি'র) বোটানিক্যাল গার্ডেনে বিলুপ্ত প্রায় বাওবাব গাছ ঐতিহ্য ধরে রেখে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে।

গতকাল মঙ্গলবার দিনাজপুর হাবিপ্রবি’র হর্টিকালচার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. হাসানুর রহমানের কাছে হাবিপ্রবি’র বোটানিক্যাল গার্ডেনের ঐতিহ্যবাহী বাওবাব গাছের বিষয় জানতে চাওয়া হলে, তিনি বাসস’কে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। 

তিনি বলেন, আমরা অনেকেই জানি, উঠ তার শরীরে পানি ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু গাছ তার কান্ডে পানি ধারণ করে রাখতে পারে। গাছ পানি ধরে রাখতে পারে, বিষয়টি শুনে অনেকেই অবাক হতে পারেন। কিন্তু এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক একটা সত্য নিদর্শন। এটি এমন এক ধরণের বাওবাব নামের গাছ, যা হাবিপ্রবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে। ওই গাছের কাণ্ডের মধ্যে লক্ষ লক্ষ লিটার পানি ধারণ করে রাখতে পারে।

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) বোটানিক্যাল গার্ডেনে অবস্থিত বিলুপ্ত প্রায় এই অদ্ভুত গাছটির নাম বাওবাব। যার বৈজ্ঞানিক নাম Adansonia Digitata। এটি মালভেসি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

তিনি বলেন, বাওবাব গাছটির বিশেষত্ব এই গাছ প্রায় ৫ হাজার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আফ্রিকায় পাওয়া কিছু বাওবাব গাছের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি। গাছের কান্ড অত্যন্ত মোটা ও বিশালাকার। একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছের কাণ্ডের ব্যাস ৩০ ফুট বা তার চেয়ে বেশি হতে পারে। কাণ্ডের ভিতরে স্পঞ্জের মতো কাঠামো থাকায় এটি প্রচুর পরিমাণ পানি জমা রাখতে পারে। একটি বড় গাছ কয়েক হাজার লিটার পানি ধরে রাখতে পারে। শুষ্ক মরু ভূমিতে এ গাছ প্রকৃতির পানি ট্যাংক হিসেবে কাজ করে। শুষ্ক অঞ্চলে টিকে থাকার জন্য এই গাছ নিজ দেহে ১ লক্ষ ২০ হাজার লিটার পর্যন্ত পানি সংরক্ষণ করতে পারে। তাই এই বৃক্ষকে ‘জলাধার গাছ’ বলা হয়। বাওবাব গাছটি সাধারণত আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলে দেখা যায়। গাছটি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় মেসিনা নামক অঞ্চলে। তাই মেসিনাকে বলা হয় ‘দ্য বাওবাব টাউন’।

বাওবাব গাছের ফুলগুলো সাধারণত বর্ষা কালের শুরুর দিকে সন্ধ্যা বেলায় ফোটে এবং মাত্র ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকে। এ গুলোর ঘ্রাণ বেশ তীব্র এবং বাদুড় ও মথ পরাগায়নে সাহায্য করে। বাওবাবের ফুলে প্রধানত বাদুড় দ্বারা পরাগায়ন হয়ে থাকে । এই কারণেই ফুল রাতেই ফোটে। বাওবাব গাছটিকে দেখলে মনে হবে এর কান্ড নিচে আর শিকড় উপরে। গাছটিতে বছরে মাত্র ৬ মাস পাতা থাকে। এই গাছে ৫টি পাপড়ি বিশিষ্ট ফুলও ধরে। ফুলের রং বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে যেমন-লাল-হলুদ-সাদা।

গাছের ফল গুলো বড় আকারের হয়। একেকটির ওজন প্রায় দেড় কেজির মতো। এদের ফল ১৮ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হয়। দেখতে অনেকটা নারকেলের মতো। বাওবাব ফলকে বলা হয় ‘সুপারফ্রুট’। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও ফাইবার। ফল থেকে পাওয়া যায় পর্যাপ্ত শাঁস, যা বেশ সুস্বাদু খাবার। টক-মিষ্টি স্বাদের বাওয়াব ফল দুগ্ধজাত খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এই ফল বানরের খুব পছন্দের। তাই এই ফলের আরেক নাম মাঙ্কি ব্রেড। গাছের ফল থেকে এক ধরনের সতেজ পানীয় তৈরি করা হয়, যা ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মানবদেহে প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক তৈরিতে সাহায্য করে বাওবাব ফল। অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে এটি সহায়ক। বাওবাব গাছের ছাল থেকে ফাইবার পাওয়া যায়। গাছের ছাল নরম, তন্তুযুক্ত এবং আগুন প্রতিরোধী হওয়ায় এই বাকল দিয়ে কাপড়, দড়ি, বাদ্যযন্ত্রের তার, পানি-নিরোধী ব্যাগ, এমনকি ছাতা তৈরি হয়। বাওবাব ফল শুকিয়ে গুঁড়ো করে খাবার, পানীয় এবং আয়ুর্বেদিক ঔষধে ব্যবহার হয়। গাছের বিভিন্ন অংশ (পাতা, ছাল, বীজ, শেকড়) ডায়রিয়া, জ্বর, প্রদাহ, ও চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

আফ্রিকার বিভিন্ন উপজাতি সমাজে এই গাছকে পবিত্র বলে বিশ্বাস করা হয়। অনেক জায়গায় এটি পূজা করা হয়ে থাকে, এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। এই গাছ গুলোর পাতা ভোজ্য হয়। গাছের পাতা সবুজ এবং চকচকে। এতে প্রোটিন, খনিজ এবং ভিটামিন এ আর সি প্রচুর পরিমাণে থাকে। ফলে, মসলা এবং ঔষধ হিসাবে এই গাছের পাতা ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাওবাব গাছটি সম্পর্কে জানতে চাইলে হাবিপ্রবি’র কৃষি অনুষদের কৃষি বনায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ শোয়াইবুর রহমান জানান, ‘হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের গাছ রয়েছে। এই গাছ গুলো যিনি যত্ন সহকারে রোপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের অগ্রপথিক প্রফেসর ড. টি.এম.টি. ইকবাল স্যার। এই কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে গাছের ক্ষেত্রে ‘বায়োলজিক্যাল হট-স্পট’ও বলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় তিনি অনেক দুর্লভ গাছ রোপণ করেছিলেন। যার অবদান এখন পযন্ত  অনেক অজানা গাছ এখানে রয়েছে। তার কর্মকালীন সময়ে হাবিপ্রবি’র বোটানিক্যাল গার্ডেনে রোপণ করা গাছগুলো তিনি ধরে ধরে আমাকে চিনিয়ে ছিলেন। বাওবাব গাছটি মূলত মরুভূমি অঞ্চলের গাছ। যা আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়। এটি ‘মালভেসি’ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Adansonia। এই গাছের প্রায় ৮টি প্রজাতি রয়েছে। গাছটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল আকৃতি, এর কান্ডটা অনেক বড় এবং একটি প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই গাছ তার কান্ডে প্রচুর পরিমাণে পানি জমা রাখতে পারে। তাই একে ‘মরুভূমির পানির আধার’ বলা হয়ে থাকে। এই গাছটির জীবনকাল অনেক দীর্ঘ সময় হয়ে থাকে। আমাদের পরিবেশে এই গাছটির অনেক গুরুত্ব রয়েছে। খরা অঞ্চলে এই গাছ পানি সংরক্ষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। এটি বিভিন্ন পাখি ও বাদুড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে এবং মাটির উর্বরতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বাওবাব গাছের ফল অনেক পুষ্টিকর; যাতে ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে।

আফ্রিকায় এর ফল থেকে জুস, পাউডার তৈরি করা হয়। এর যে পাতা রয়েছে, তার নির্যাস, জ্বর ও ডায়রিয়া নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। এর বাকল থেকে দড়ি এবং কাপড়ের মতো আঁশ তৈরি করা যায়। বাংলাদেশে মূলত এই বাওবাব গাছটি অনেক বিরল। তবে কিছু পুরনো গাছ এখনো টিকে আছে তার মধ্যে রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি এলাকায় একটি ঐতিহাসিক বাওবাব গাছ আছে।  হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গাছটি লাগানো হয়েছে। যা এখন পযন্ত দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে। পরিশেষে এটাই বলব, এটি একটি অদ্ভুত আকৃতির পরিবেশ বান্ধব উপকৃত গাছ। শীতকালে এই গাছের পাতা ঝরে যায়। মানুষের জীবন ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই গাছ। এর দীর্ঘ জীবনকাল, পানি সংরক্ষণ ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে এটি পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান একটি গাছে পরিণত হয়েছে বলে তিনি ব্যক্ত করেন।’

ল্যাব, ক্লাস, পরীক্ষা শেষে ক্লান্ত অবসন্ন থাকে শিক্ষার্থীদের মন মানসিক প্রশান্তির খোঁজে বিশ্রাম নিতে বোটানিক্যাল গার্ডেনে আসা হয় শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে বিকেলের দিকে যখন মৃদু হাওয়া বয়ে যায়, সে মুহূর্তে বোটানিক্যাল গার্ডেনে বসে থাকার এক অনন্য তৃপ্তি অনুভূত হয়। সন্ধ্যায় বসে গানের আসর, বন্ধুদের গল্প আড্ডায় মেতে থাকে বোটানিক্যাল গার্ডেন। হাজারো শব্দের অনুভূতি, ব্যাথা, প্রশান্তির মিশ্রণ এই বোটানিক্যাল গার্ডেন। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীরা বাস্তবিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছেন।

হাবিপ্রবি’র ২১ ব্যাচের কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী আশিক শাহারিয়ার ও জুলহাস ফেরদৌস জানান, ‘পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি পেতে প্রতিদিন কিছু সময় এখানে আমরা আসি। প্রকৃতির মাঝে থাকলে মনে হয় নতুন শক্তি ফিরে পাই। নিজ ফ্যাক্যাল্টির সামনে এ ধরনের একটি বিরল প্রজাতির গাছ দেখতে পারছি। সত্যি এটি একটি আনন্দের বিষয়।