বাসস
  ৩১ মে ২০২৬, ১২:৩৮

রাজবাড়ীতে তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষি জমি 

তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় জেলার তিন ফসলী কৃষি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। ছবি: বাসস

॥ মোশারফ হোসেন ॥ 

রাজবাড়ী, ৩১ মে, ২০২৬ (বাসস) : তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় জেলার তিন ফসলী কৃষি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে রাজবাড়ীর বাসিন্দারা। 

রাজবাড়ী সদর উপজেলার চরবেণী নগর নদীর পার এলাকার কৃষক করম আলী বাসসকে বলেন, আমাদের পদ্মা নদীর চর এলাকায় আগে বাদাম, গম, ধানসহ বিভিন্ন সবজির বাম্পার ফলন হত । কিন্তু তামাক চাষের কারণে নদীর পলিমাটি তার উর্বরতা হারাচ্ছে। এখন আর আগের মতো ফসল ফলে না। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলা সদরে ১০ হেক্টর, গোয়ালন্দে ১০ হেক্টর, পাংশায় ১ হেক্টর, কালুখালিতে ৮ হেক্টর এবং বালিয়াকান্দিতে ৪ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে। এ বছর জেলায় মোট ৩৩ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।

গোয়ালন্দের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসান বাসসকে বলেন, স্বাস্থ্য বিধি মেনে না চললে বেশির ভাগ সময় তামাকের সংস্পর্শে থাকলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

দৌলতদিয়া এলাকার চাষি নজরুল ম-ল বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো আর্থিক সুযোগ সুবিধা বেশি দেওয়ায় চাষিরা অন্য ফসলের চেয়ে তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছে।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আনোয়ার শেখ বলেন, নদীর পাড় ঘেঁষে তামাক চাষ করায় আমরা স্কুলে যাতায়াতের সময় অসুস্থ হয়ে পড়ি। অনেকেরই মাথা ঘোরায় ও বমি করে। 

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, আগামীতে কোম্পানিগুলো তামাক চাষে কৃষকের আর্থিক সুবিধা আরো বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এতে তামাক চাষ আরও বেড়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।

মিজানপুরের সাবেক চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান বলেন, সরকারিভাবে তামাক চাষে কোম্পানিগুলোকে আইনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না করলে কৃষক নগদ আর্থিক লাভের আশায় তামাক চাষ করা থেকে বিরত নাও থাকতে পারে।

তামাক চাষ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, তামাক চাষ পরিবেশ, মানবস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রক্রিয়া। এটি শুধু ধূমপায়ীদেরই ক্ষতি করে না, বরং এর চাষাবাদ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে জড়িত কৃষক ও প্রকৃতিকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক চাষের সাথে জড়িত চাষিরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। তামাক পাতা তোলার সময় ত্বক দিয়ে নিকোটিন শোষিত হয়। এর ফলে কৃষকরা ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এর লক্ষণ হিসেবে মাথা ঘোরা, বমি হওয়া ও দুর্বলতা দেখা দেয়। আবার তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় সৃষ্ট ধূলিকণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে ঢুকে হাঁপানি (অ্যাজমা), ব্রংকাইটিস ও ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। 

কৃষিবিদদের মতে, তামাক চাষ পরিবেশের ক্ষতি করে এবং মাটির উর্বরতা কমায়। তামাক গাছ মাটি থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে পুষ্টি উপাদান (বিশেষ করে পটাশিয়াম ও নাইট্রোজেন) টেনে নেয়। এর ফলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও তামাক চাষে অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পার্শ্ববর্তী জলাশয়, নদী ও পুকুরে মিশে জলজ প্রাণী ও মাছের মারাত্মক ক্ষতি করে। 

তারা বলেন, ধান, গম বা ডালের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য আবাদের জমিতে তামাক চাষ করার ফলে দেশে খাদ্য সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দেয়। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের কারণে মাটির উপকারী অণুজীব এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী কীট-পতঙ্গ ও পাখির বংশবিস্তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কৃষকদের স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ রক্ষায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশে তামাক চাষ কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।