বাসস
  ৩০ মে ২০২৬, ১০:৪২

কীটনাশক মুক্ত টমেটো চাষে সাফল্য

ছবি : বাসস

॥ রুস্তম আলী মন্ডল ॥

দিনাজপুর, ৩০ মে, ২০২৬ (বাসস) : দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) গত ৪ বছর ধরেই রাসায়নিক কীটনাশক মুক্ত টমেটো চাষে গবেষণায় সফলতা অর্জন করেছে। এই সফলতার পেছনে যার অবদান তিনি হচ্ছেন কৃষি অনুষদের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক।
গতকল শুক্রবার দিনাজপুর হাবিপ্রবি’র গবেষক কৃষি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক বাসস’কে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। 

তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে তিনি ও তার দল কোনো রকম রাসায়নিক বিষ ও হরমোন ব্যবহার ছাড়াই খুবই স্বল্প মাত্রায় ইউরিয়া, ফসফরাস ও ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহারে টমেটো চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। 

এটা ছিল তার হাবিপ্রবি’র ক্যাম্পাসে গবেষণার জমিতে অর্জিত টমেটোর সফল উৎপাদন। জেলার সদর উপজেলা চেহেলগাজী ইউনিয়নের টমেটো চাষি মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে সম্প্রতি কৃষকের একটি দল তার গবেষণায় অর্জিত টমেটো ক্ষেত পরিদর্শন করেছেন। বিনা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া এত সুন্দর টমেটোর ফলন দেখে অভিভূত হয়েছেন পরিদর্শনকারী কৃষকরা। এ সময় মাঠের পাকা টমেটো আগত কৃষকরা পরিদর্শনকালে খেয়ে দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

মাঠে অর্জিত সফল গবেষণায় টমেটোর ক্ষেত কৃষকদের কাছে আধুনিক যুগে কৃষি বিপ্লবে সবজি চাষে ব্যতিক্রমধর্মী একটি টমেটো ক্ষেত বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। 

তারা বলেছেন, আমরা টমেটো চাষ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেকবার বিভিন্ন রাসায়নিক সার, বালাই নাশক ও কীটনাশক ব্যবহার করে থাকি। এছাড়াও অনেক পরিমাণের ইউরিয়া সার, ফসফেটসহ গোবর সার ব্যাবহারে টমেটোর ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হই। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু হাবিপ্রবি’র উন্নত টমেটো সফল গবেষক সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হকের নেতৃত্বে উদ্ভাবিত কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াও রাসায়নিক সার স্বল্প পরিমাণ ব্যবহারে টমেটোর ফলন দেখে পরিদর্শনে আগত কৃষকদের বিশ্বাসই হচ্ছে না। 

এখানে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয়নি। অথচ তারা প্রমাণ পেয়েছে, এই টমেটোর ফলনে ক্ষেতে শতভাগ নিশ্চিত কোনো কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া, সফল ও বাম্পার টমেটোর দৃশ্যমান ফলন উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।

পরিদর্শনে আসা কৃষক দলের সদস্য কৃষক হারেজ উদ্দীন ও মতিউর রহমান জানান, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই টমেটোর এত ফলন এবং এত সুন্দর রং, খেতেও অনেক সুস্বাদু। কৃষক দলের প্রতিনিধিরা বলেছেন, হাবিপ্রবি’র গবেষক সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হকের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করতে পারলে আমাদের টমেটো চাষে উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে। সেই সঙ্গে টমেটোর রং এবং সাইজের জন্য আগামীতে উৎপাদিত টমেটোর অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারবেন বলে তারা আশাবাদী। 

কৃষকরা আশা করছেন, আমরা চাইবো, হাবিপ্রবি’র গবেষক সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক স্যার যেন ‘আমাদের অল্প পরিসরে হলেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে তার নতুন উদ্ভাবিত টমেটো চাষে আমরা যেন অধিক ফলন অর্জন করে বিপ্লব ঘটাতে পারি’। সেই প্রত্যাশা তারা করছেন।

আগত কৃষকরা বলেছেন,এই ধরনের টমেটো বছরে রবি ও গ্রীষ্মকালীন দু’টি মৌসুমে পরিকল্পনা মাফিক পদ্ধতি প্রয়োগে সফলভাবে চাষ করা সম্ভব হবে। যেহেতু গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে এ ধরনের উৎপাদিত টমেটো বাজারজাত করতে পারলে ভোক্তরা স্বাস্থ্য সম্মত টমেটো সহজেই ক্রয় করে খেতে পারবেন।

দিনাজপুরের প্রান্তিক অঞ্চলের আরও একজন কৃষক বাসস’কে জানান, গবেষক স্যারের বিনা রাসায়নিক সার ব্যবহারে টমেটোর উৎপাদন দেখে ভালো লাগছে। আমরা সাধারণ কৃষকরা টমেটো চাষে স্যারের তুলনায় অনেক বেশি কীটনাশক ও সার ব্যবহার করি। আবার স্যারের এই ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে টমেটো চাষে আমাদের স্বাস্থের কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা নিজেরাও নিশ্চিন্তে বিষমুক্ত,স্বাস্থ্য সম্মত এই টমেটো খেতে পারবো। একই সাথে ভোক্তাদেম মাঝে স্বাস্থ্য সম্মত টমেটো সরবরাহ করতে পারব। আমরা টমেটো চাষে সারের এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে আগ্রহী। গত কয়েক দিন পূর্বে কৃষকদের নিয়ে তার টমেটোর ক্ষেতের প্রদর্শনী করা হয়েছিল। প্রদর্শনী শেষে ড. আজিজুল হক কৃষকদের সঙ্গে তার উদ্ভাভিত টমেটো চাষের সফলতা নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। 

রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে ব্যকটেরিয়া ব্যবহার করার উপকারিতা, পদ্ধতি নিয়ে কৃষকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তিনি সরাসরি দিয়েছেন। কৃষকরা তার এ ধরনের উত্তরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

গতকাল শুক্রবার সহযোগী অধ্যাপক ড. আজিজুল হক বাসস’কে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন থেকে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে বিষ, হরমোনমুক্ত ও স্বল্প মাত্রার ফার্টিলাইজার প্রয়োগে সুস্বাদু টমেটো উৎপাদন নিয়ে গবেষণা করছি। ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে টমেটোর ফলন ও গাছের শাখা উপ-শাখা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। আমার লক্ষ্য টেকসই উন্নয়নের জন্য আমার এই গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া। এরফলে টমেটো চাষে রাসায়নিকের ব্যবহার কমবে, কৃষক লাভবান হবে বেশি। ভোক্তা সাধারণ মানুষ,উন্নত ও ভাল স্বাস্থ্যকর উৎপাদিত টমেটো খেতে পারবে। আমরা এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

গবেষক ড. আজিজুল হক বর্তমানে ‘দ্য সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন এজেন্সি ও ইউনেস্কোর দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সাইন্সেস’-এর যৌথ অর্থায়নে রাসায়নিক কৃষি সামগ্রীর পরিবর্তে এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে টমেটো চাষে গবেষণা করছেন। ইতোমধ্যেই তার এই গবেষণা প্রযুক্তি ব্যবহার করে দিনাজপুর ভিন্ন তিন স্থানে কৃষকের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ শুরু করেছে। তিনি এসব টমেটো চাষীদের কীটনাশক ও রাসায়নিক সারমুক্ত টমেটো চাষে সব ধরনের উপদেশ, পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান।