বাসস
  ২১ মে ২০২৬, ২১:১১
আপডেট : ২১ মে ২০২৬, ২১:৫০

ঘাটতি নেই, চট্টগ্রামে ট্রাকে ট্রাকে আসছে কোরবানির পশু

ছবি : বাসস

চট্টগ্রাম, ২১ মে, ২০২৬ (বাসস): পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে ট্রাকে ট্রাকে আসছে কোরবানির পশু। বর্তমান মজুত ও দেশের অন্যান্য জেলা থেকে আসা সরবরাহ মিলিয়ে এবার চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ইতোমধ্যে গরু, ছাগল ও মহিষ আসতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম নগরী ও উপজেলার পশুর হাটগুলোতে। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৮১টি। এর বিপরীতে স্থানীয় খামারিদের কাছে মজুত রয়েছে মাত্র ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু। এর বাইরে স্থানীয় কৃষক ও গৃহস্থের লালিত-পালিত গরু-ছাগল ও বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পশুর জোগানে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর ঘাটতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং কিছু পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। 

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর যে সামান্য ঘাটতি রয়েছে সেটা রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বেপারীদের পশু দিয়ে পূরণ হবে। এছাড়াও খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় চাহিদার চেয়ে কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এগুলোও চট্টগ্রামের বাজারে আসছে। এর বাইরে স্থানীয় কৃষক ও গৃহস্থদের পালিত গরু ছাগল কুরবানির পশুর জোগান দেবে। 

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে পশুর হাটের পাশাপাশি বিভিন্ন খামার, এমনকি রাস্তা ও অলিগলিতেও গরু-ছাগল ওঠা শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাকে ট্রাকে পশু আসছে। যা দিয়ে স্থানীয় চাহিদা মিটবে, এবং কিছু পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। 

প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামে ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টি এবং ২০২৩ সালে ছিল ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫টি। সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে কিছুটা কমে চলতি বছর উৎপাদন ৭ লাখ ৮৩ হাজারে নেমে আসে। 

সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে প্রতিপালিত পশুর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯৯টি ষাঁড়, ৯০ হাজার ৪৮৮টি বলদ, ৩৩ হাজার ৭৯২টি গাভী, ৪৭ হাজার ৮৩৪টি মহিষ, ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি ছাগল, ৪১ হাজার ৪২৩টি ভেড়া এবং অন্যান্য ৯৬টি পশু।

তথ্যে আরও দেখা যায়, চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চল ও উপজেলাগুলোতে পশু উদ্বৃত্ত থাকলেও নগর এলাকায় ঘাটতি বেশি। উপজেলাগুলোর মধ্যে মিরসরাইয়ে ৬ হাজার ৫১০টি, সন্দ্বীপে ১১ হাজার ৬০৪টি, সীতাকু-ে ৩ হাজার ২৩০টি, ফটিকছড়িতে ৭ হাজার ৮১৮টি এবং লোহাগাড়ায় ৬ হাজার ৯৭৬টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এছাড়া বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে।

অন্যদিকে, নগরীর পাঁচলাইশ এলাকায় ৩০ হাজার ১৫২টি, কোতোয়ালিতে ৩১ হাজার ১৫৮টি এবং ডবলমুরিং এলাকায় সর্বোচ্চ ৪৭ হাজার ২০টি পশুর ঘাটতি রয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, গ্রামাঞ্চলের উদ্বৃত্ত পশু শহরে সরবরাহ হচ্ছে। এছাড়া দেশে বর্তমানে ২২ লাখের বেশি কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে, দেশীয় পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে এবং ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম হাঁকানোর সুযোগ পাবে না।

কর্ণফুলী এলাকার গরু খামারি মো. আসাদ বলেন, উৎপাদন কমার পেছনে মূল কারণ গো-খাদ্য, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়া। গো-খাদ্য ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন। এর খেসারত দিচ্ছেন ছোট খামারিরা। খরচ বাড়ার কারণে সামাল দিতে না পেরে অনেকে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পশু উৎপাদনে।

এদিকে, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে জমতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গরু, ছাগল, মহিষসহ অন্যান্য পশু বাজারে আনছেন ব্যবসায়ীরা। সিটি কর্পোরেশনের স্থায়ী ও অস্থায়ী ৬টি পশুর হাট ছাড়াও নগরীর অলিগলি ও খামারগুলোতে চলছে গরু বেচা-কেনা। তবে প্রাথমিক অবস্থায় বেচাবিক্রি কম বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

বৃহস্পতিবার নগরীর মুরাদপুরের বিবিরহাটে গিয়ে দেখা গেছে, বাজারে সরবরাহ থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থেকে গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন মো. মোহসীন। তিনি জানান, তাদের একটি টিম কুষ্টিয়া থেকে আনুমানিক ১৪০টি গরু নিয়ে চট্টগ্রাম এসেছে। চট্টগ্রাম নগরের বিবিরহাট, সাগরিকা ও পাহাড়তলি বাজারে তারা এই গরুগুলো বিক্রির জন্য রয়েছেন। এখনো পর্যন্ত তারা একটি গরুও বিক্রি করেননি। শুক্রবার থেকে গরু বিক্রি শুরু হবে বলে তিনি আশা করেন।

জলিল আহমেদ নামে এক পশু বিক্রেতা বলেন, এবার খাদ্য, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ সবকিছুই বেড়েছে। তাই পশুর দাম কিছুটা বেশি হচ্ছে। আমরা ন্যায্য দাম চাইছি, লোকসান দিয়ে বিক্রি করা সম্ভব না। 

হাটে আসা শামীম হোসেন নামে এক ক্রেতা বলেন, গরুর দাম গত বছরের তুলনায় একটু বেশি মনে হচ্ছে। তাই আমরা বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখছি, তারপর কিনব। ঈদের জন্য ভালো পশু দরকার, কিন্তু বাজেটও দেখতে হচ্ছে।

এদিকে, পশুর হাট ছাড়াও নগরের ২ নম্বর গেইট, বহদ্দারহাট, অক্সিজেনসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বাসাবাড়িতে এবং স্থানীয়ভাবে গরু বিক্রি করতে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি অ্যাগ্রো ফার্মগুলোতেও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

এবার বাজারে দেশি গরুর সরবরাহ পর্যাপ্ত জানিয়ে চন্দনাইশের খামারি আবু তাহের বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের খামার আর কৃষকের ঘরে সযত্নে লালিত-পালিত গরুর সমাগম বেশি। এই গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি। 

ক্রেতারা কোরবানির পশুর দাম বেশি বলে অভিযোগ করলেও ব্যবসায়ী ও খামারিরা বলছেন, দাম ঠিকই আছে। তাদের প্রত্যাশা দুই একদিনের মধ্যে বাজার জমে উঠবে।