বাসস
  ২১ মে ২০২৬, ১৫:১৫

নেত্রকোণায় জমজমাট মদনপুর পশুর হাট 

ছবি: বাসস

মো. তানভীর হায়াত খান

নেত্রকোণা, ২১ মে, ২০২৬ (বাসস) : আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে নেত্রকোণা জেলার অন্যতম বড় পশুর হাট মদনপুরে কোরবানি পশুর বেচাকেনা পুরোদমে জমে উঠেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে এই হাট। এ বছর প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত গরুর মজুত থাকায় এ হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়। 

সরেজমিনে গতকাল বুধবার দিনব্যাপী মদনপুর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে লোক সমাগম শুরু হলেও মূলত দুপুর ১২টার পর বাজার পুরোপুরি জমে ওঠে। শুধুমাত্র নেত্রকোণা জেলাই নয় বরং পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ জেলা থেকেও অসংখ্য ক্রেতা-বিক্রেতা এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা এই হাটে এসে ভিড় জমিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শফিউল্লাহ ফকির বাসস’কে বলেন, আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে এখানে গড়ে ওঠা একটি কাঁচাবাজারকে কেন্দ্র করে ধলাই নদীর তীরে এই পশুর হাটটি গড়ে ওঠে। শুধুমাত্র কোরবানির ঈদেই নয়, সারা বছর জুড়েই প্রতি সপ্তাহের বুধবারে এই বাজারে গবাদিপশু বেচাকেনা করেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। 

বাজারের ইজারাদাররা বাসস’র সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এই হাটে ৫০ হাজার টাকার নিচের পশুর জন্য ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই ৩শ’ টাকা করে এবং ৫০ হাজার টাকার অধিক মূল্যের পশুর জন্য ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই ৫শ’ টাকা করে হাসিল বা টোল দিতে হয়। এই হাটে সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি পাইকারি ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বাজারে শাহিওয়াল, ফ্রিজিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ানসহ বিভিন্ন শংকর জাতের বড় আকৃতির গরুর প্রচুর সরবরাহ থাকলেও ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ ও চাহিদা ছিল দেশি প্রজাতির গরুর দিকে। বিশেষ করে ৯০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের দেশি গরুর চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি।

জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর গ্রামের খামারি রিপন মিয়া নিজের গোয়ালে লালন-পালন করা একটি দেশি গরু নিয়ে বাজারে এসেছেন। তিনি গরুটির দাম ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা হাঁকালেও ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা হলে বিক্রি করবেন বলে জানান। একই উপজেলার বলাইশিমুল গ্রামের পাভেল মিয়া একটি বড় আকৃতির গরু বাজারে এনে ২ লাখ টাকা দাম হাঁকান এবং শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৬২ হাজার টাকায় তা বিক্রি করেন। পাভেল মিয়া জানান, লালন-পালনের খরচ বাদ দিয়ে এই গরুটি থেকে তার ৭০ হাজার টাকা মুনাফা হয়েছে। 

হাটে আসা কেন্দুয়া উপজেলার গরুর পাইকার হুমায়ুন কবীর বাসস’কে বলেন, তিনি বছরজুড়েই গরুর ব্যবসা করেন। এক বাজার থেকে কিনে অন্য বাজারে মুনাফায় বিক্রি করাই তার পেশা। আজকের বাজারে তিনি ২টি দেশি প্রজাতির গরু এনে প্রতিটি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা করে দাম হাঁকিয়েছেন এবং ১ লাখ ১৫ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি করার মনস্থির করেছেন।

সদর উপজেলার লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের কাজির আমাটি গ্রামের হবিকুল মিয়া তার একটি দেশি গরু ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তিনি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দাম হাঁকালেও মাত্র ২ হাজার টাকা কমে গরুটি হাতবদল করেন। হবিকুল মিয়া বলেন, সামনের হাটগুলোতে বাজার দর কেমন হয় তা নিশ্চিত নয়। তাই বেশি লাভের অপেক্ষা না করেই গরুটি বিক্রি করে দিয়েছেন।

বাজারে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল থেকে আসা বেশ কয়েকজন পাইকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এই হাট থেকে গরু কিনে ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বড় বড় হাটে সরবরাহ করবেন।

ঈদের আরও বেশ কিছুদিন বাকি থাকায় হাটে আসা অধিকাংশ ক্রেতাই মূলত বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি এবং দরদাম যাচাই-বাছাই করতে এসেছেন। তবে দামে মিলে যাওয়ায় অনেকেই আবার পছন্দের পশু কিনে বাড়ি ফিরছেন।

আটপাড়া উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের ক্রেতা সোনা মিয়া বাজারে এসে নিজের পছন্দের গরু কিনেছেন। তিনি বাসস’কে বলেন, আজকের বাজারের দরদাম ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই বেশ সহনশীল এবং মাঝারি ধরনের মনে হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষই আশা করছেন, ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, বাজারে পশুর বেচাকেনা আরও বৃদ্ধি পাবে।

হাওর উপজেলা মদনের দেওয়ান বাজার, সদর উপজেলার মজিহাটি বাজার, চুচুয়া, চল্লিশা, শিমুলকান্দির বাজার, রাজুর বাজার, বারহাট্টা উপজেলার নৈহাটি বাজারসহ জেলার দশটি উপজেলাতেই জমজমাট হয়ে উঠেছে   কোরবানির পশুর বাজার।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে নেত্রকোণা জেলায় মোট ১১ হাজার ৬৯৩ জন খামারি গবাদিপশু প্রস্তুত করেছেন। এরমধ্যে শুধু গরুর সংখ্যাই ৮৪ হাজার ৫৭৮টি। সব মিলিয়ে জেলায় এবার মোট কোরবানির গবাদিপশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৮টি। এর বিপরীতে জেলায় এবার কোরবানির সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৬৭টি পশু। সে হিসেবে চাহিদা পূরণ করার পরও জেলায় উদ্বৃত্ত থাকবে ১৯ হাজার ১২১টি গবাদিপশু।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর নেত্রকোণায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ হাজার বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। ফলে জেলার বাইরে থেকে পশু আনার কোনো প্রয়োজন হবে না। এছাড়া হাটে আসা পশুদের রোগমুক্ত ও স্টেরয়েডমুক্ত হওয়া নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে ৩৯টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম নিয়োজিত রয়েছে।’

নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সর্বমোট ১১৩টি স্থায়ী পশুর হাট বসেছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত আসন্ন ঈদের প্রস্তুতিমূলক সভায় পশুর হাটের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়সহ যেকোনো ধরনের অনিয়ম রোধে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সাথে ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, জাল টাকা শনাক্তকরণ এবং মলম পার্টি বা অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পশুর হাটগুলোতে সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবেন বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।