বাসস
  ১৮ মে ২০২৬, ১৬:৫৯
আপডেট : ১৮ মে ২০২৬, ১৭:৪৪

কোরবানির হাট কাঁপাতে টাঙ্গাইলে প্রস্তুত ২৭ মণের ‘রাজাবাবু’

ছবি : বাসস

\ মহিউদ্দিন সুমন \

টাঙ্গাইল, ১৮ মে, ২০২৬ (বাসস) : বিশালদেহী ‘রাজাবাবু’ নামে ২৭ মণ ওজনের ষাঁড় গরুটি টাঙ্গাইলে কোরবানির হাট কাঁপাতে প্রস্তুত। ‘রাজাবাবু’ কোনো সিনেমার নাম নয়, বরং বিশালদেহী এটি একটি ষাঁড়ের নাম। রাজার মতো করে লালন-পালন করা হয়েছে বলেই ষাঁড়টির নামকরণ করা হয়েছে ‘রাজাবাবু’। ১ হাজার ১০০ কেজি ওজনের (২৭ মণ) বেশি ‘রাজাবাবু’কে ইতিমধ্যে কিনতে দরদাম করছেন পাইকাররা।

আসন্ন কোরবানি ঈদের জন্য টাঙ্গাইল পৌরসভার বেড়াবুচনা এলাকার মীর ছানোয়ার আলী এগ্রো এন্ড ডেইরি খামারে প্রস্তুত করা হয়েছে এটি। এ গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৮ লাখ টাকা। সাড়ে ৩ বছর বয়সী (দুই দাঁতের) গরুটি লম্বায় ১১ ফুট এবং উচ্চতায় ৬ ফুট। ‘রাজাবাবু’ শুধু একটি গরুর নাম নয়, যেন এক রাজকীয় উপস্থিতির প্রতীক। বিশাল দেহ, শান্ত স্বভাব আর দৃষ্টিনন্দন গঠনের কারণে টাঙ্গাইল জুড়ে এখন তাকে ঘিরেই আলোচনা।

কালো রঙের গরুটিকে এক নজর দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ছোটখাটো একটি হাতি দাঁড়িয়ে আছে। 

হলিস্টাইন ফ্রিজিয়ান জাতের ‘রাজাবাবু’ খামারের সবার কাছে খুব আদরের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে বলেই তার নাম রাখা হয়েছে ‘রাজাবাবু’। বিশাল আকৃতি আর নবাবী আচরণে ইতোমধ্যেই এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে গরুটি। শুধু আকারেই নয়, এই গরু লালন-পালন ও পরিচর্যার পেছনের গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। শুধু রাজাবাবুই না আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে এ ফার্মে ১০ টি বিশালদেহী ষাঁড় গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোট বড় মোট ২৬ হাজার ৭৫৯ টি খামার রয়েছে। প্রতিটি খামারেই পর্যাপ্ত পরিমাণ দেশীয় গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। খামারিরা এ সব গবাদি পশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। আশানুরূপ দাম পাবে তাই শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন তারা।

সরেজমিনে টাঙ্গাইল পৌরসভার বেড়াবুছনা এলাকার মীর ছানোয়ার আলী এগ্রো এন্ড ডেইরি খামারে গিয়ে দেখা মেলে সাড়ে ৩ বছর বয়সী কালো ‘রাজাবাবু’কে দেশীয় পদ্ধতির খাবার খাইয়ে লালন পালন করছেন খামারের মালিক মীর সজিবুজ্জামান। পশুর হাট কাঁপাতে আসছে সে। গরুর মালিকের দাবি, এটিই এখন পর্যন্ত তার জানামতে টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বড় গরু। ইতিমধ্যে গরুটি কিনতে দরদাম করছেন পাইকাররা।

মীর ছানোয়ার আলী এগ্রো এন্ড ডেইরি’র মালিক মীর সজিবুজ্জামান বাসস’কে বলেন, ২০২৪ সালে এ গরুর ফার্মটির যাত্রা শুরু করেন। প্রতি বছর কোরবানি ঈদে বিক্রির জন্য ৩০ থেকে ৪০ টা ষাঁড় গরু লালন-পালন করেন। এ বছর রাজাবাবুর পাশাপাশি ১৩ থেকে ১৫ মণের ১০ টি ষাঁড় গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রেখেছি।

রাজাবাবু সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ ফার্মে প্রায় ৫ বছর আগে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে হলস্টেইন জাতের গর্ভবতী অবস্থায় একটি গাভী ক্রয় করেন। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রেখে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে লালন পালন করা ওই গাভিটি একটি ষাঁড় বাচ্চার জন্ম দেয়। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে দীর্ঘ সাড়ে ৩ বছর ধরে লালন-পালন করে ‘রাজাবাবু’কে প্রস্তুত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, একদিন বয়স থেকেই ওকে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করেছি। গরুটি আচার আচরণ স্বভাব রাজাদের মতো, ময়লা জায়গায় থাকতে চায় না, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন খাবার দাবার খায়। আচরণও রাজার মতো। তাই ষাঁড়টির নাম দেওয়া হয়েছে ‘রাজাবাবু’।

তিনি আরো বলেন, ছোটবেলা থেকেই ‘রাজাবাবু’ আমাদের পরিবারের প্রিয় সদস্য। শুরু থেকেই কোনো রকম কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ ইনজেকশন বা ফিড ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক খাদ্য দিয়েই বড় করা হয়েছে। গরুটিকে প্রতিদিন খাওয়ানো হয় নিজ জমিতে উৎপাদিত ঘাস, খড়, গম ও ভুট্টা মিশিয়ে তৈরি করা বিশেষ খাবার। ফলে গরুটি যেমন সুস্থ রয়েছে, তেমনি আকৃতিতেও হয়েছে চমকপ্রদ। গরুটি এখন বিক্রির জন্য প্রস্তুত। আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন অনেক মানুষ গরুটিকে দেখতে আসেন। ওর বিশালতা দেখে বিস্মিত হন অনেকেই।

মীর সজিবুজ্জামান বলেন, দ্রব্যমূল্যের উদ্ধর্ধগতির বাজারে পশু পালনের ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে কয়েকগুণ। ন্যায্য দাম না পেলে বড় ধরণের লোকসানে পড়ার ভয় তাদের। জেলায় চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত পশু থাকলেও গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক দাম হওয়ায় চিন্তিত তারা। ভারতীয় গরু আসা বন্ধ করা গেলে লাভের মুখ দেখবেন বলে আশা করছেন তিনি। সে জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন যাতে ভারতীয় গরু দেশে না আসে।

খামারের কর্মচারী সোহেল মিয়া বাসস’কে জানান, এ খামারে কোরবানির জন্য আরও ১০টি গরু প্রস্তুত রয়েছে। এ গুলোর নাম রাখা হয়েছে বাহাদুর, সম্রাট, সিম্বা ইত্যাদি। কিন্তু এই মধ্যে রাজাবাবুর জনপ্রিয়তা সবার ওপরে। 

খামারের আরেক পরিচর্যাকারী সুবাহান মিয়া বলেন, একদিন বয়স থেকে রাজাবাবুকে লালন-পালন করেছি। প্রতিদিন সময় মেনে সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় ওকে খাবার দিচ্ছি। খাদ্যতালিকায় আছে ভুট্টা, সয়াবিন, খইল, গমের ভুসি, তিলের খইল, ধানের কুঁড়া, খড় ও সবুজ ঘাস। গরম লাগবে বলে ওর ঘরে ফ্যান লাগিয়ে দিছি। 

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হেলাল উদ্দিন খান বাসস’কে বলেন, জেলায় অনেক খামারিই শৌখিনভাবে বিশাল আকারের গরু লালন-পালন করছেন। আমরা তাদের নিয়মিত তদারকি ও সার্বিক পরামর্শ দিচ্ছি। খামারিরা যাতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজা করেন, সে বিষয়ে খামারিদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হয়। ফলে প্রাকৃতিক উপায়ে খামারিরা গরু মোটাতাজাকরণ করে বেশ লাভবান হচ্ছে।

তিনি জানান, মীর ছানোয়ার আলী এগ্রো এন্ড ডেইরি খামারে অন্যতম ‘রাজাবাবু’ নামের ষাঁড় গরুটি আমরা সব সময় পর্যবেক্ষণে রেখেছি। চিকিৎসার বিষয়ে নানা ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হয়েছে। প্রত্যাশা করি ‘রাজাবাবু’কে বিক্রি করে ফার্মের মালিক যেন ন্যায্যমূল্যে পান।