শিরোনাম

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান
খুলনা, ১০ মে ২০২৬ (বাসস) : প্রথমবারের মতো মহানগরীর সড়কে যুক্ত হচ্ছে ফ্লাইওভার। এরই মধ্য দিয়ে খুলনা মহানগরীর সড়ক অবকাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে।
নগরীতে নির্মাণাধীন উড়াল সড়কসহ তিন লিংক রোড প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৭১৫ কোটি টাকার এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৭০-৭৫ শতাংশ।
প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় সূত্র জানায়, মহানগরীতে যানজট নিরসন ও চলাচল সহজ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্মাণ কাজ শেষ হলে যানজটের ভোগান্তি কমবে বলে আশা নগরবাসীর। সব মিলিয়ে খুলনার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করেছে উড়াল সড়কসহ তিন লিংক রোড প্রকল্প। নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত সংযোগ সড়কের ওপর তৈরি হচ্ছে এই উড়াল সেতু। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
উড়াল সেতুসহ প্রায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নতুন ৪ লেন সড়ক প্রকল্পের মূল কাজ প্রায় ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের পরিচালক।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এর আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রায়ের মহল এবং বাস্তুহারা পয়েন্ট থেকে পুরাতন সাতক্ষীরা মোড় পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। যার মাঝামাঝি অংশে থাকছে একটি দৃষ্টিনন্দন উড়ালসেতু। এই অংশের কাজ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে সড়কের বিভিন্ন অংশে ঢালাই, পিলার স্থাপন ও সংযোগ কাঠামোর কাজ দৃশ্যমান।
একই প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে রায়ের মহল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এই অংশের অগ্রগতি প্রায় ৪০ শতাংশ। এছাড়া বাস্তুহারা এলাকা থেকে পুরাতন সাতক্ষীরা সড়ক পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ তৃতীয় সড়কের কাজও ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ৭১৫ কোটি টাকার প্রকল্পের তিনটি লিংক রোড চালু হলে নগরীর ভেতরে প্রবেশ ও বের হওয়ার বিকল্প পথ তৈরি হবে। বর্তমানে যে-সব ভারী যানবাহন শহরের প্রধান সড়ক ব্যবহার করে যানজট বাড়ায়, তারা সরাসরি সিটি বাইপাস ব্যবহার করতে পারবে। এতে নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কে চাপ কমবে এবং যাতায়াত সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা বলছেন, নতুন সড়ক চালু হলে নিরালা, রায়ের মহল ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে আবাসন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়বে। ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় জমির দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
ট্রাক চালক মনসুর হায়দার বলেন, প্রতিনিয়ত গল্লামারি দিয়ে শহরে প্রবেশ বা বের হতে হয়। তবে সড়কটিতে সব সময়ই যানজট লেগেই থাকে। নতুন-এ সড়কটির কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। নতুন এ সড়কটি চালু হলে গল্লামারি সড়কের উপর চাপ অর্ধেকটা কমে আসবে। আমরা আরও দ্রুত শহর থেকে বের হতে বা প্রবেশ করতে পারবো।
আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।
নিরালা এলাকার ব্যাংক কর্মকর্তা সৌরভ মজুমদার বলেন, মোটর সাইকেলে করে প্রতিদিন আমাকে বাগেরহাটের ফকিরহাটে চাকরির জন্য যেতে হয়। গল্লামারি দিয়ে যাতায়াত করতে গেলে পথেই আমার এক ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। সড়কটি এখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। তবে আমি এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত শুরু করেছি। এ সড়কটি চালু হলে, আমার মতো অনেকেই এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। তাতে আমাদের কর্মঘণ্টা বেঁচে যাবে।

তবে প্রকল্পের নকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, উড়ালসড়কের নিচ দিয়ে যান চলাচলের সুযোগ রাখা হয়নি। যা ভবিষ্যতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নিরালা মোড়ের বর্তমান অবকাঠামো অপর্যাপ্ত বলে দাবি তাদের।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের খুলনা চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি আসিফ আহমেদ বলেন, নিরালা মোড় প্রশস্ত না করলে এবং আংশিক পুনঃ নকশা না করা হলে নতুন সড়ক চালু হওয়ার পরও সেখানে যানজট তৈরি হতে পারে। বড় প্রকল্পে ছোট নকশাগত সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ সড়কটির পুনঃ নকশা প্রয়োজন।
প্রকল্পের নকশায় কিছু ত্রুটি আছে দাবি করে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবর রহমান মুন্না বলেন, ‘নকশাগত কিছু ত্রুটি এবং আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে যেভাবে গিয়েছে সেটি সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করতে পারবে না। তাই সড়কটি আরও প্রশস্ত এবং লিংক রোড আরও বাড়ানো দরকার। এতে নগরবাসীর বেশি সুবিধা হবে।’
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী ও থ্রি-লিংক রোড প্রকল্পের পরিচালক মোরতোজা আল মামুন বাসসকে বলেন, ৩০০ মিটারের ওভারপাস নির্মাণ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। ব্রিজের কাজ ৭০-৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আর সড়কের কাজ ৫০-৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে।’
তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা পেছালেও নতুন সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। সময় ও নকশা সংশোধনের কারণে ব্যয় না বাড়িয়ে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।