শিরোনাম

॥ আল-আমিন শাহরিয়ার ॥
ভোলা, ১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : জেলার মূল ভূ-খণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন অন্ধকারাচ্ছন্ন দ্বীপ উপকূলীয় জনপদ মনপুরায় এবার আলো জ্বলবে সাব মেরিন ক্যাবলে যুক্ত বিদ্যুতে। জাতীয় গ্রীডের সাথে যুক্ত হবে লক্ষাধিক মানুষের বিচরণভূমি শতবছরের উপকূলীয় দ্বীপ মনপুরা। যুগের পর যুগ বিশাল জলরাশির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আলোহীন পলিমাটির এ জনপদের মানুষগুলোর নিদারুন কষ্টের কথা চিন্তা করে মানবতার আলো ছড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন সরকার প্রধান তারেক রহমান। ওই জনপদের অবহেলিত মানুষের জন্য এটি ছিলো সরকার প্রধানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির এক অনন্য উপহার। জাতীয় নির্বাচন পূর্ব চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে নির্বাচনী জনসমাবেশে
দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তখন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, দেশের উপকূলীয় দ্বীপ মনপুরাকে একটি পর্যটন নগরীতে পরিণত করতে যত প্রকার উন্নয়ন দরকার সবই তিনি করবেন।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি দ্বীপ মনপুরা হবে দেশের অপার সম্ভাবনার অনন্য এক অপরুপ পর্যটন ক্ষেত্র। চরফ্যাশন-মনপুরা অর্থাৎ ভোলা-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়নের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও দাবি’র প্রেক্ষিত তারেক রহমান মনপুরা দ্বীপটিতে ব্যাপক উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। অবশেষে ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের তিন মাসের মধ্যেই দ্বীপটিতে নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলে জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করে বিদ্যুৎ পৌছানোর সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত হয়। কাজটির টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে বিদ্যুৎ সংযোগকর্ম তড়িৎ গতিতে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ সম্পন্ন হলেই তারেক রহমান প্রতিশ্রুতির আলো জ্বলবে অন্ধকারাচ্ছন্ন দ্বীপ মনপুরায়।
তথ্যমতে, সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্র্রীডের বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মানের টেন্ডার আহ্বান করেছে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে এটি হতে পারে বিএনপি সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগ এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্টিভিউশন কোম্পানী লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ‘মনপুরা দ্বীপে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
দরপত্রটি ‘ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপ টেন্ডারিং মেথড (ঙঝঞঊঞগ)’পদ্ধতিতে আহ্বান করা হয়েছে এবং প্রকল্পের অর্থায়ন করা হবে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রবিউশন কোম্পানি -এর নিজস্ব তহবিল থেকে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগ্রহী ঠিকাদারদের গত ১০ বছরের মধ্যে কমপক্ষে দু’টি অনুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ৩৩ কেভি বা তার অধিক ক্ষমতার সাবমেরিন কেবল স্থাপন,পরীক্ষণ ও চালুকরণের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের অনুরূপ ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে বিদেশে অন্তত একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অগ্রাধিকার পাবে।
এ ছাড়া, সাবমেরিন কেবল স্থাপনে ব্যবহৃত জাহাজের মডেল, ধরন ও সক্ষমতার প্রমাণপত্র জমা দেয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। আগামী ২৫ জুন ২০২৬ দরপত্র জমা দেয়া যাবে এবং একই দিন বিকেল দরপত্র খোলা হবে। দরপত্রের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ হাজার টাকা।
সাবমেরিন ক্যাবলে মনপুরা দ্বীপে বিদ্যুতের এ পরিকল্পনাটি বাস্তবে রুপ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পার্শ্বে থেকে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন। তিনি বাসস’কে বলেন, অবহেলিত মনপুরাবাসীর দু:খ-কষ্ট আর বঞ্চনাময় জীবনযাত্রার কথা জানতে পেরেছেন সরকার প্রধান। সে কারনেই দেশনায়ক তারেক রহমানের সদিচ্ছার ফসল হিসেবে লাখো লোকালয়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাচীণ দ্বীপ জনপদ মনপুরাবাসী অবশেষে আলোকিত হচ্ছেন। তথ্যমতে,একসময়কার ওলন্দাজ,পর্তূগীজ আর মগদের আবাস্থলখ্যাত মনপুরা দ্বীপটি ছিলো সর্বদাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। দূর্ভোগ আর দুর্যোগপ্রবণ এক অবহেলিত জনপদের নাম মনপুরা। যখন বিশ্বময় সভ্যতার বিকাশের প্রসার ঘটছে, সে সময়ও দ্বীপের মানুষদের থাকতে হচ্ছে-অন্ধকারময় প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত এক ঘুমোট পরিবেশে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা অবশেষে যুক্ত হতে যাচ্ছে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সাথে। বছরের পর বছর বিদ্যুৎ সংকটে থাকা এ উপকূলের দ্বীপে হাতেগোনা গুটি কয়েক মানুষ ডিজেল চালিত একটি জেনারেটর দিয়ে দিনে-রাতে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পেত না। এবার সেই অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে আলোকিত হতে যাচ্ছে দ্বীপ জনপদের বসতিপূর্ণ মনপুরা।
সেখানকার বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী কে.এম. ফরিদুল ইসলাম বাসস’কে জানান, জাতীয় গ্রিডের সাথে সংযুক্ত হলে দ্বীপ মনপুরার দৃশ্যপট পাল্টে যাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনপুরা উপজেলার রামনেওয়াজ ও বাংলাবাজারে দু’টি বেসরকারি সোলার প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ৫শ’ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১ হাজার ১শ’ ৯৯ জন গ্রাহককে ইউনিট প্রতি ৩৫ টাকা হারে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, মনপুরা উপজেলা বরিশাল বিভাগ এর ভোলা জেলার দক্ষিণে অবস্থিত। এ উপজেলার মোট আয়তন ৩৭৩.১৯ বর্গ কিলোমিটার। এটি ভোলা জেলার একটি দ্বীপ উপজেলা এবং বাংলাদেশের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। মনপুরা থানা ৪ টি ইউনিয়ন, ২২ টি মৌজা ও ৩৩ টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মনপুরা উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৮৯,৮৮৯ জন। তবে, বিভিন্ন সূত্রে জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়; যেমন, একটি সূত্র অনুযায়ী উপজেলাটির মোট জনসংখ্যা ৮৯,৭৪৫ জন এবং জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৪০ জন। আরেকটি সূত্র অনুযায়ী, মনপুরা উপজেলার জনসংখ্যা ৭৬,৫৮২ জন ছিল। বর্তমানে এ জনসংখ্যা লক্ষাধিক হয়েছে বলে স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
বিদ্যুতে পাল্টাবে দৃশ্যপট:
মনপুরায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দ্বীপের দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। প্রথমত: যে পরিবর্তনটি দৃশ্যমান হবে, তা হলো- বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা। বর্তমানে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের জন্য সামান্য বিদ্যুৎ, তা-ও আবার অনিয়মিত,সীমিত বা ব্যয়বহুল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেলে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, বাজার, স্কুল, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশাসনিক দপ্তর, ব্যাংকিং সেবা, ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা নতুন গতি আসবে।
মনপুরার শিক্ষার্থীরা যদি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সুবিধা পায়, তবে তারা দেশের মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হতে পারবে। দ্বীপের শিশুরাও ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন রিসোর্স এবং তথ্য-প্রযুক্তির সুযোগ পাবে। এটি শুধু বর্তমানের সুবিধা নয়; ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির বিনিয়োগ।
স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে সু-দূরপ্রসারী। মনপুরার অর্থনীতি কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ থাকলে মাছ সংরক্ষণ, বরফ তৈরি, কোল্ড স্টোরেজ, ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সেলাই, ওয়ার্কশপ, মিল, ডিজিটাল সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, পর্যটন সেবা, সবকিছুই শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে মৎস্যজীবী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যুৎ নতুন আয়-সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাড়বে উৎপাদন:
অভিজ্ঞরা বলছেন,বিদ্যুতের ব্যবহার উৎপাদনশীল খাতে বাড়াতে হবে। শুধু ঘরে আলো জ্বালানো নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র শিল্প, নারী উদ্যোক্তা, ডিজিটাল সেবা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ কীভাবে কাজে লাগবে, সে বিষয়ে স্থানীয় পরিকল্পনা দরকার। উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, ব্যবসায়ী, কৃষক, মৎস্যজীবী, নারী সংগঠন, যুব সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বিদ্যুৎ-পরবর্তী উন্নয়ন পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
মনপুরার জন্য এই প্রকল্প তাই একটি সুযোগ। তবে সুযোগকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিদ্যুৎকে উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। বিদ্যুৎ এলে দোকান খোলা থাকবে বেশি সময়, শিক্ষার্থীরা পড়বে রাতে, হাসপাতাল জরুরি সেবা দিতে পারবে, মৎস্যজীবী মাছ সংরক্ষণ করতে পারবে, নারী উদ্যোক্তা উৎপাদন বাড়াতে পারবেন, তরুণরা অনলাইন কাজ বা প্রশিক্ষণে যুক্ত হতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ পৌঁছানোর এই উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু একটি উপজেলার জন্য নয়; বাংলাদেশের অন্য দ্বীপ ও বিচ্ছিন্ন জনপদের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা রাজধানী বা বড় শহরের সীমা ছাড়িয়ে নদী, চর, দ্বীপ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনে পৌঁছায়।
সরকারী তথ্যমতে,সেখানকার মানুষ মৎস্য ও কৃষি ভিত্তিক পেশার সাথে তাদের জীবন জীবিকা পরিচালনা করে থাকেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন দ্বীপ মনপুরা হচ্ছে-সংসদীয় আসন ভোলা-৪।
প্রাকৃতির সৌন্দর্যের লীলাভূমি নয়নাভিরাম মনপুরা হচ্ছে-ভোলার মূল ভূ-খণ্ড থেকে প্রায় ৮০ কিঃ মিঃ দূরে সাগরের বুকে জেগে উঠা এক জনবহুল দ্বীপ। মনগাজী নামে এখানকার একজন অধিবাসী বাঘের আক্রমণে নিহত হন। তার নামানুসারেই দ্বীপটিকে ‘মনপুরা’ নামকরণ করা হয় বলে প্রচলিত রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে মেঘনার মোহনায় ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মনপুরা উপজেলায় লক্ষাধিক লোকের বসবাস রয়েছে।
ভোলার জেলা প্রশসাক ডা. মো.শামীম রহমান বাসস’কে বলেন, বর্তমান সরকার উপকূলীয় দ্বীপ মনপুরাকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নানাবিধ কার্যকরী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন। আর এর জন্য প্রথম শর্ত হচ্ছে দ্বীপটিতে শক্তিশালী বিদ্যুতায়ন। এটি বাস্তবায়ন হলে এখানে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। তখন সাগর মোহনার এই জনপদ হবে ভ্রমন পিপাসু দেশি বিদেশি পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরুপ অভয়ারণ্য আর প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব পাবে সরকার।