শিরোনাম

ঢাকা, ২৩ জুলাই ২০২৬ (বাসস) : ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের মেয়েদের ফুটবলে বরিশাল অঞ্চলকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে রাজশাহী অঞ্চল। আর দলের এই বিশাল জয়ের পেছনে একক অবদান এক কিশোরীর, যার জাদুকরী পা থেকে এসেছে ম্যাচের পাঁচটি গোলের চারটিই। তিনি আর কেউ নন, রাজশাহীর নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার বিস্ময় বালিকা জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা। এক, দুই, তিন... তারপর চার! প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে গোলের পর গোল করে জালের ঠিকানা খুঁজে নিয়েছেন তিনি।
সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এই ফরোয়ার্ডের ফুটবলের আঙিনায় উঠে আসার গল্পটা অন্য সাধারণ দশটা মেয়ের মতো সহজ ছিল না; বরং তা এক চরম ত্যাগ, দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ভাঙার অনন্য রূপকথা।
ফারিহার পারিবারিক জীবন চরম প্রতিকূলতা আর অভাব-অনটনে ঘেরা। তাঁর বাবা বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। এক বোন ও এক ভাইসহ ফারিহাদের পাঁচ জনের এই সংসারটি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মা, যিনি স্থানীয় রাস্তায় দিনমজুরের কাজ করেন। মায়ের সেই সামান্য আয়ের ওপর ভর করেই চলে ফারিহাদের পুরো সংসার।

সংসারের এই টানাপোড়েনের মধ্যেও ফুটবলের স্বপ্নকে বুকে আগলে রেখেছেন ফারিহা। বাবার অনুপস্থিতিতে নিজের সামান্য জমিতে ভাইয়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধান রোপণ কিংবা পাট ধোয়ার মতো কঠিন কায়িক পরিশ্রমও করতে হয় তাকে। ফুটবলার হওয়ার তীব্র তাড়নায় প্রতিদিনের ক্লান্তি উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নাটোর বেঙ্গল একাডেমিতে গিয়ে নিয়মিত কঠোর অনুশীলন করেছেন তিনি।
পারিবারিক সমর্থন থাকলেও ফারিহার ফুটবলার হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি। মেয়ে মানুষ কেন হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে, পড়ালেখা শেষ করে অল্প বয়সে বিয়ে করে সন্তান ও সংসার সামলানোই মেয়েদের একমাত্র কাজ- গ্রামীণ সমাজের এমন হাজারো কটু কথা ও কটূক্তি প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে তাকে। লোকলজ্জা আর সমাজের সেই বাঁকা চোখকে একপাশে ঠেলে ফারিহা তাঁর লক্ষ্য স্থির রেখেছেন। এই লড়াইয়ে তাঁর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর মা এবং কোচ মোহাম্মদ জুয়েল। অনুশীলনে যাওয়ার মতো যাতায়াত ভাড়া কিংবা ভালো বুট কেনার টাকা যখন ফারিহার পরিবারের ছিল না, তখন পিতার মতো তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন কোচ জুয়েল, দিয়েছেন যাতায়াত ভাড়াও।
তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার এই যাত্রাটা ফারিহার জন্য যেমন ছিল কষ্টের, তেমনি আনন্দের। তৃতীয় শ্রেণি থেকে ফুটবলের আঙিনায় পা রাখা ফারিহা উপজেলা পর্যায়ে ইনজুরির কারণে খেলতে না পারলেও, চোট সারিয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জাতীয় আসরে নিজের জাত চিনিয়েছেন।
মাঠে বসে বরিশাল ও রাজশাহীর মধ্যকার পুরো ম্যাচটি উপভোগ করেছে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ফুটবল ডিসিপ্লিনের বাছাই কমিটি, যেখানে ফারিহার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো।
জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা ফারিহার প্রিয় ফুটবলার। প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে নিজের জার্সির নম্বর তিনি বেছে নিয়েছেন ১৭। ম্যাচে একা চার গোল করার কৃতিত্ব অবশ্য একা নিতে নারাজ এই বিনয়ী কিশোরী। তাঁর মতে, দলের অন্য সহখেলোয়াড়দের দারুণ পাসের কারণেই তিনি গোল করতে পেরেছেন। ডাগআউটে বসে থাকা অতিরিক্ত খেলোয়াড়রা যাতে মাঠে নামার সুযোগ পায়, সেজন্যই পুরো দল আগে থেকে বেশি গোল করার পরিকল্পনা করেছিল। কোনও ক্লান্তি, অভাব কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা যাকে থামাতে পারেনি, গ্রামীণ জনপদের সেই মেঠো পথ থেকে শুরু হওয়া ফারিহার সাইকেলযাত্রা হয়তো একদিন পৌঁছে যাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, যেখানে লাল-সবুজের জার্সি গায়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবেন এই লড়াকু কিশোরী।