শিরোনাম

ঢাকা, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬(বাসস) : ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিষয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘একটি সভ্য সমাজে এমন অবিবেচক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন রায় প্রত্যাশিত নয়।’
নুসরাত হত্যা মামলায় ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, ৪ আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অন্য ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস দিয়ে গত ২৪ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্ত্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ। ১১২ পৃষ্ঠার সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি আজ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, শ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেওয়ার কারণেই নুসরাতকে হত্যা করা হয়। আর এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দ্দৌলা। তার নির্দেশ মোতাবেক এই হত্যার পরিকল্পনা, সহায়তা ও নকশা বাস্তবায়নের সঙ্গে সিরাজসহ ছয় আসামি জড়িত। যা আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত ও প্রমাণিত হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ কাউন্সিলর ও আফসার উদ্দীনের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনো প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, অথচ তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল এবং এই ধরনের একটি অবিবেচক রায়ের কারণে তারা ৭ বছরের বেশি সময় ধরে নির্জন কারাকক্ষে বন্দী জীবন কাটান।
এই মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে মাত্র দুটিকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, একটি সভ্য সমাজে এমন অবিবেচক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন রায় প্রত্যাশিত নয়।
ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে বিচারিক সংবেদনশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, দণ্ডবিধি ও দণ্ডবিধির মৌলিক বিষয়গুলো শেখা পর্যন্ত তাকে দায়রা এখতিয়ারের বাইরে রাখা উচিত। সুতরাং, আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে- সে পর্যন্ত রায় প্রদানকারী ট্রাইব্যুনালের বিচারককে দায়রা এখতিয়ার থেকে প্রত্যাহার করা হোক।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে যে ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তারা হলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম। যে ৪ আসামির সাজা কমিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় তারা হলেন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের ও উম্মে সুলতানা পপি। হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে যে ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয় তারা হলেন- সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসা শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
আদালতে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দীকা, মাহবুবা তাসনিম আঁখি ও আল আমিন সিদ্দিকী। আসামি পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজালাল, এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, মোহাম্মদ শিশির মনির।
ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল। এ ঘটনার ৫ দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর এই মামলার রায় দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। ট্রাইব্যুনালের সে রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে।
দেশে নারী শিশু নির্যাতনের কয়েকটি নির্মম ঘটনার প্রেক্ষাপটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুধু নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ও আপিল শুনানির জন্য গত ১০ জুন বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। বিশেষ এই বেঞ্চে ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলাটি শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়। শুনানি শেষে গত ২৪ আগস্ট এই মামলার রায় দেন হাইকোর্ট।