শিরোনাম

ঢাকা, ২২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): রাজধানী ঢাকার ৪১৬ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্রের গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী চলচ্চিত্র উৎসব।
‘হৃদয়ে ঢাকা-৪১৬’ উৎসবের অংশ হিসেবে আজ শনিবার রাজধানীর মতিঝিলের ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা সিনেমা হলে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ উৎসবের উদ্বোধন করা হয়।
উৎসব উপলক্ষে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের বরেণ্য শিল্পী, কলাকুশলী, সাংবাদিক এবং ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহগুলোকে ঢাকার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আগামী ২৮ আগস্ট পর্যন্ত মধুমিতা হলে দর্শকদের জন্য বিনামূল্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের ১৪টি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন ডিএসসিসির এ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘হৃদয়ে ঢাকা-৪১৬’ উৎসবের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে চলচ্চিত্রের যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে তা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা সম্ভব।
দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় সারা দেশে সাড়ে আটশোর বেশি সিনেমা হল চালু থাকলেও বর্তমানে এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন ও আধুনিক মাল্টিমিডিয়ার সহজলভ্যতায় দর্শকদের রুচি ও চলচ্চিত্র দেখার ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। তাই দর্শকদের রুচি ও চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে সরকারের প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে পুনরায় গতিশীল করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দর্শকদের ভালো সিনেমা উপহার দিতে পারলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও আবার সুদিন ফিরে আসবে। সম্মাননা প্রদান এবং বিনামূল্যে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মতো উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান এবং ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে চলচ্চিত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তুলে ধরা সম্ভব।
তিনি বলেন, চলচ্চিত্র ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস যথাযথভাবে চিত্রায়িত করা সম্ভব নয়। রাজধানী হিসেবে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নগরী। এ শহরের গৌরবময় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেশ-বিদেশে তুলে ধরতেই ডিএসসিসি এ উৎসবের আয়োজন করেছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক নগরবাসীকে আগামী সাত দিন পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনদের নিয়ে মধুমিতা হলে এসে বিনামূল্যে চলচ্চিত্র উপভোগের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পী ও কলাকুশলীদের সম্মাননা দেওয়া হয়। সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেত্রী সুজাতা আজিম, সুচন্দা, আনোয়ারা, ববিতা, নূতন, চম্পা ও শাবনাজ; অভিনেতা উজ্জ্বল, সোহেল রানা, আলমগীর, খাজা নাঈম মুরাদ ও আজাদ রহমান শাকিল।
এ ছাড়া গীতিকার মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান মনির, সংগীতশিল্পী খুরশিদ আলম ও আবিদা সুলতানা, সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান ও শওকত আলী ইমন, চিত্রগ্রাহক রেজা লতিফ ও শফিকুল ইসলাম স্বপন এবং চলচ্চিত্র পরিচালক ছটকু আহমেদ, হাফিজ উদ্দীন, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, মতিন রহমান, সাইদুর রহমান সাঈদ ও আওকাত হোসেন সম্মাননা পেয়েছেন।
মরণোত্তর সম্মাননা পেয়েছেন দেশের চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ পরিচালক আব্দুল জব্বার খান, নাজির আহমেদ, খান আতাউর রহমান, জহির রায়হান, এহতেশাম, মুস্তাফিজ, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত, দিলীপ বিশ্বাস ও চাষী নজরুল ইসলামসহ বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা।
এ ছাড়া অভিনেতা আবদুল মতিন, খলিল উল্লাহ খান, নায়করাজ রাজ্জাক, রোজী আফসারী, খান জয়নুল, প্রবীর মিত্র ও বুলবুল আহমেদ; গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার; সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ ও আলাউদ্দীন আলী; সংগীতশিল্পী আজম খান ও এন্ড্রু কিশোর এবং চিত্রগ্রাহক আফজাল চৌধুরী ও এম. এ. সামাদকে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়।
চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য চিন্ময় মুৎসুদ্দী, রফিকুজ্জামান, অনুপম হায়াৎ, মাহমুদা চৌধুরী ও আবদুর রহমানকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ঢাকার চলচ্চিত্র সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহ্যবাহী লায়ন সিনেমা হল, আজাদ সিনেমা হল ও মধুমিতা সিনেমা হলকেও বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।
বিনামূল্যে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী :
উৎসবের আওতায় মধুমিতা হলে প্রতিদিন বিকেল ৩টা ও সন্ধ্যা ৬টায় দুটি করে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হবে। সর্বসাধারণের জন্য এসব প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকবে।
২২ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় প্রদর্শিত হবে ‘মুখ ও মুখোশ’।
২৩ আগস্ট বিকেল ৩টায় ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ‘১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন’ প্রদর্শিত হবে।
২৪ আগস্ট বিকেল ৩টায় ‘জীবন থেকে নেওয়া’ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ‘নান্টু ঘটক’ প্রদর্শিত হবে।
২৫ আগস্ট বিকেল ৩টায় ‘অশিক্ষিত’ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ‘রংবাজ’ প্রদর্শিত হবে।
২৬ আগস্ট বিকেল ৩টায় ‘সবুজ সাথী’ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ‘নাচের পুতুল’ প্রদর্শিত হবে।
২৭ আগস্ট বিকেল ৩টায় ‘দূরদেশ’ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ‘দহন’ প্রদর্শিত হবে।
উৎসবের শেষ দিন ২৮ আগস্ট বিকেল ৩টায় ‘দোস্ত দুশমন’ এবং সন্ধ্যা ৬টায় ‘বধু বিদায়’ প্রদর্শিত হবে।
ডিএসসিসি জানিয়েছে, ‘হৃদয়ে ঢাকা-৪১৬’ উৎসবের মাধ্যমে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি নগরবাসীর মধ্যে নিজের শহরের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি উদার, আধুনিক ও সংস্কৃতিবান্ধব ঢাকা বিনির্মাণে এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।