শিরোনাম

ঢাকা, ১৭ জুন, ২০২৬ (বাসস): পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু দূরদর্শী আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মত দিয়েছেন জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আরও স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আজ রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কী পেল?’ শীর্ষক এক সংলাপে এসব মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংলাপে সিপিডির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিষয়ক বাজেট বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রীতি।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার কর ও শুল্ক-সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়েছে, যা গ্রীন এনার্জির প্রতি সরকারের অঙ্গীকারকে আরও জোরালো করেছে।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহার, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য ৫ শতাংশ কর রেয়াত এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগ সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ ব্যয় কমাবে এবং নতুন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
হেলেন মাশিয়াত প্রীতি আরো বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা এ খাতে সরকারের অব্যাহত গুরুত্বের প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সঞ্চয়ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকারের পদক্ষেপ টেকসই জ্বালানি উন্নয়নের দিকে ইতিবাচক নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণায় বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনার কথাও উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ইভি চার্জিং সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার, বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং ইভি মালিকানার ক্ষেত্রে আয়কর হ্রাস।
দেশীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গ্যাস অনুসন্ধান সম্প্রসারণ, সমুদ্র এলাকায় দরপত্র আহ্বান এবং অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকেও স্বাগত জানান হেলেন মাশিয়াত প্রীতি। পাশাপাশি জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, স্মার্ট গ্রিড, স্মার্ট মিটারিং এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়সংক্রান্ত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামো আধুনিক হবে এবং ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার সহজ হবে।
সিপিডির এই গবেষক মনে করেন, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সঞ্চয়ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য দেওয়া আর্থিক প্রণোদনা বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তর লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প আরও সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার দ্রুত আধুনিকায়ন এবং অতিরিক্ত সবুজ আর্থিক প্রণোদনা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গবেষণায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহায়তা বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন, সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং একটি সমন্বিত সবুজ আর্থিক নীতিকাঠামো প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়।
সংলাপ সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, সিস্টেম লস কমানো এবং সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
মোয়াজ্জেম বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
সংলাপে অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সিপিডি সমীক্ষায় এই উপসংহার টানা হয়েছে যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের জন্য একটি পরিচ্ছন্নতর, অধিকতর স্থিতিস্থাপক ও জ্বালানি-নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। একই সাথে, টেকসই ও কার্যকর জ্বালানি খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে।