শিরোনাম

ঢাকা, ৭ জুন, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সহজতর করতে এবং চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যকার ‘রাজস্ব বৈষম্য’ দূর করার আহ্বান জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
আজ রোববার রাজধানীর সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে রাজস্ব বৈষম্য : জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সমাধান’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
গবেষণায় বলা হয়, বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামোর কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিগুলো কৃত্রিমভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রযুক্তির তুলনায় কম প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় রয়েছে।
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, বছরের পর বছর ধরে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ৯৫ শতাংশেরও বেশি বরাদ্দ পেয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পগুলো। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলো পেয়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশেরও কম বরাদ্দ।
তিনি আরো বলেন, এ ধরনের বৈষম্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করেছে এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথে দেশের অগ্রযাত্রাকে মন্থর করেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে করের বোঝা সবচেয়ে কম। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) শূন্য এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ন্যূনতম হওয়ায় এর মোট করভার (টিটিআই) মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
এর বিপরীতে, স্বল্প-কার্বনভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, গ্রিড অবকাঠামো এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের মতো প্রযুক্তির ওপর করের বোঝা ৬১ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশেরও বেশি।
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বর্তমান কর কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব আহরণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, সৌর ও বায়ুশক্তি খাতের তুলনায় এলএনজি খাতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি বছর সম্ভাব্য ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা থেকে ১ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব হারাচ্ছে।
এতে আরো বলা হয়, সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধার কারণে এলএনজি আমদানিকারকরা অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে দেওয়া হয় না।
সিপিডির গবেষণায় জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে যুক্ত বিশাল ভর্তুকির বোঝাকেও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গড় ভর্তুকি প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৭.৫ টাকা, যেখানে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ২০.১৮ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি পেয়ে থাকে।
অথচ, প্রচলিত কর কাঠামোর কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন্দ্রগুলো বিপুল পরিমাণ প্রাথমিক বিনিয়োগের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও কোনো ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পায় না।
সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে গবেষণায় সৌর ও বায়ুশক্তি সরঞ্জামের ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও গ্রিড অবকাঠামোর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, এলএনজি আমদানির ওপর বর্তমান শূন্য ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহার করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পুনর্বহাল এবং জ্বালানি সংরক্ষণ ও বৈদ্যুতিক পরিবহন প্রযুক্তির ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদকদের জন্য বৈষম্যমূলক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ব্যবস্থা বন্ধ করারও আহ্বান জানানো হয়। এতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসান কমবে বলে মত দেওয়া হয়।
ড. মোয়াজ্জেম স্মার্ট গ্রিডের উন্নয়ন এবং দেশব্যাপী বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার ত্বরান্বিত করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সবুজ ভর্তুকি ও অনুদান চালু করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির গবেষণা দলের সদস্য হেলেন মাশিয়াত প্রীতি এবং আতিকুজ্জামান সাজিদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।