শিরোনাম

ঢাকা, ২০ মে, ২০২৬ (বাসস) : রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন ৩৯ বছর বয়সি শুমাইয়া আক্তার। সুখের সংসার। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি করেন। গৃহিণী শুমাইয়া সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন তার তিন সন্তান নিয়ে। বড় মেয়ে নিজে নিজে স্কুলে যেতে পারলেও ছোট দুই ছেলেকে প্রতিদিন স্কুল আনা-নেওয়া করতে হয় তাকে। স্কুল ছাড়াও সন্তানদের আছে নানা অ্যাক্টিভিটিজ। মূলত সারা দিন বলতে গেলে সন্তানদের পিছনেই ব্যয় করতে হয় শুমাইয়াকে। সন্ধ্যার পর কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরেন স্বামী। এরপর সঙ্গত কারণেই তাকে কিছুটা সময় দিতে হয় শুমাইয়াকে। এসব করে নিজের জন্য যে সময় বের করবেন বা নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেবেন-তা আর হয়ে উঠে না।
গত কয়েক মাস ধরে তার শরীরটা মোটেই ভালো যাচ্ছে না। বিশেষ করে মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা আর দীর্ঘসময় ধরে মাসিক তাকে প্রায় কাবু করে ফেলছে। ডাক্তারের কাছে যে যাবেন তার সময়ও পাচ্ছেন না।
কিন্তু সহ্য করতে না পেরে একদিন স্বামীকে নিয়ে যান একজন স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ বা গাইনোকলজিস্টের কাছে।
গাইনোকলজিস্ট সব শুনে কিছু পরীক্ষা করতে দেন। রিপোর্ট পাওয়ার পর জানা গেল শুমাইয়া অ্যাডেনোমায়োসিস রোগে আক্রান্ত। অ্যাডেনোমায়োসিস অর্থাৎ জরায়ু রোগে আক্রান্ত।
অ্যাডেনোমায়োসিস একটি জরায়ুর রোগ যেখানে জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ (এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু) জরায়ুর পেশির ভেতরে বেড়ে ওঠে। এটি নারীদের মধ্যে তীব্র মাসিক ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, পেলভিক ব্যথা এবং কখনও বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। সাধারণত ৩০ বছরের বেশি বয়সি নারীরা এ রোগে ভুগে থাকেন।
বিশিষ্ট গাইনোকলজিস্ট ডা. মনোয়ারা বেগম বলেন, অ্যাডেনোমায়োসিস লক্ষণ প্রায় সময় ধীরে ধীরে দেখা যায়। অ্যাডেনোমায়োসিস-এর বিভিন্ন লক্ষণ আছে। যেমন- মাসিক দীর্ঘস্থায়ী হয়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। তলপেটে তীব্র ব্যথা হতে পারে। এছাড়া যৌন মিলনের সময় ব্যথা হতে পারে।
তিনি বলেন, এ রোগ সম্পর্কে অনেক নারীই সচেতন নন। তারা মনে করেন, এসব উপসর্গ স্বাভাবিক। তাই ডাক্তারের কাছে যান না। ফলে রোগ তীব্র আকার ধারণ করে। তবে যে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া দরকার।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর এপ্রিল মাসে অ্যাডেনোমায়োসিস সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। মূলত এ রোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য।
ডা. মনোয়ারা বলেন, অ্যাডেনোমায়োসিস রোগটি মূলত ৩০ বছর থেকে ৫০ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তবে এখন আরো বেশি বয়সি নারীদের এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অ্যাডেনোমায়োসিস রোগে আক্রান্ত হয় মূলত যখন জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ জরায়ুর পেশির ভেতরে প্রবেশ করে। এর ফলে মূলত জরায়ু বড় হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
তিনি বলেন, অ্যাডেনোমায়োসিস শুধু শারীরিক সমস্যা নয়। এর সাথে জড়িত নারীর মানসিক স্বাস্থ্য। প্রচণ্ড ব্যথা এবং দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নারীকে প্রচণ্ডভাবে দুর্বল করে তোলে। এর ফলে তারা ক্লান্ত এবং হতাশ হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে রোগটি শনাক্ত হলে সহজে চিকিৎসা সম্ভব হয়। তবে দেরি হলে জটিলতা বেড়ে যায়। এতে আক্রান্ত নারী শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি বলেন, এ রোগ সম্পর্কে আরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকেও এগিয়ে আসতে হবে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে পারে।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. কাজী মর্জিনা বেগম বলেন, আমাদের সমাজে নারীরা এখনো তাদের অনেক রোগ সম্পর্কে ঠিকভাবে সব কিছু জানে না। অনেক রোগকেই তারা কখনো কখনো স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে মনে করে থাকে। কিন্তু নারীদের অনেক রোগই বেশ জটিল, যেমন অ্যাডেনোমায়োসিস। তবে একটু সচেতন হলে এবং নিয়মিতভাবে ডাক্তারের পরামর্শ নিলে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। অ্যাডেনোমায়োসিস বা জরায়ু রোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে একজন নারীকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে।