বাসস
  ১৯ মে ২০২৬, ১৭:৪১

পারিবারিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষায় নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সহায়ক

ঢাকা, ১৯ মে, ২০২৬ (বাসস): চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোরগঞ্জের রুখসানা আক্তার (ছদ্মনাম) কাজের সন্ধানে ২০২৩ সালে ঢাকায় তার খালার বাসায় আসে। ইচ্ছে ছিল চাকরি করে গ্রামে তার বাবা-মা’র কাছে টাকা পাঠাবে। কাজও পায় মিরপুরের একটি ছোট গার্মেন্টেসে। কিন্তু এক বছর পার না হতেই সেই গার্মেন্টসের আরেক সহকর্মীর সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। আর মাত্র ষোল বছর বয়সেই প্রথম সন্তানসম্ভবা হয় রুখসানা।

এটা শুধু রুখসানার গল্প নয়। এরকম আরো হাজারো পোশাককর্মীর বিয়ে হচ্ছে আঠারো বছরের আগেই। এমনকি তারা সন্তানও জন্ম দিচ্ছে আঠারো বছরের আগে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা যায়, পোশাক শিল্পে কমর্রত প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী শ্রমিক ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই গর্ভধারণ করছেন। 

গবেষণার রিপোর্ট মতে এই নারীদের প্রতি তিনজনের একজন জীবনে অন্তত একবার অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণের শিকার এবং প্রতি চারজনের একজনের গর্ভপাত বা মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ মাস ধরে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

নগরীর কড়াইল ও মিরপুর বস্তি এবং গাজীপুরের টঙ্গী বস্তিতে আইসিডিডিআরবির আরবান হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেলেন্সের আওতাধীন এলাকায় এ গবেষণা চালানো হয়। বিষয়বস্তু ছিল পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার।

গবেষণা মতে, তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী ৭৭৮ জন শ্রমিকের অংশগ্রহণে প্রতি ছয় মাস অন্তর জরিপের মাধ্যমে গবেষণাটি করা হয়। 

এতে দেখা যায়, পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রতি তিনজন নারীর দুজনের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।

এতে দেখা যায়, গবেষণা জরিপ চলাকালে শুরুতে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা ছিল ৪৯ শতাংশ। দুই বছর পর ফলোআপ করার সময় সচেতনতা বেড়ে ৭০ শতাংশ হয়। এ সময় জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি বা ট্যাবলেট সম্পর্কেও উল্লেখযোগ্য সচেতনতা বাড়ে।

শুরুতে ১৫ শতাংশ নারী এ সম্পর্কে জানতেন, যা পরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ শতাংশ। একই সময়ে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মতামতের প্রাধান্য দেওয়ার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

নারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তাদের স্বামীর সহিংসতার হার ছিল অনেক বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এ সময় কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার হারও তাদের মধ্যে অনেক বেশি ছিল। গবেষণার শুরুতে প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী পোশাক শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, যা দুই বছর পর বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ শতাংশে।

সহিংসতার শিকার নারীরা প্রায় কেউই আনুষ্ঠানিক সাহায্য চান না। শুরুতে ৩৫ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক (পরিবার বা বন্ধুদের কাছে) সাহায্য চেয়েছিলেন, দুই বছর পর এই হার কমে দাঁড়ায় ২১ শতাংশে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কিছু পরামর্শমূলক সেবা থাকলেও প্রয়োজনীয় সেবা সরবরাহ সীমিত। জরিপে অংশ নেওয়া শ্রমিকেরা যেসব কারখানায় কাজ করেন, সেগুলোর মধ্যে শুধু ২২ শতাংশ কারখানায় স্যানিটারি প্যাড পাওয়া যায়। মাত্র ১৪ শতাংশ কারখানায় পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সরবরাহের তথ্য মিলেছে।

গবেষণা মতে, নারী শ্রমিকদের মধ্যে যারা অন্তত নয় বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং তুলনামূলক বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন, তাদের কিশোরী বয়সে (১৫-১৯ বছর) গর্ভধারণের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। আর যারা সন্তান ধারণের আগেই গর্ভনিরোধক ব্যবহার শুরু করেছিলেন, তাদের কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ৪৭ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা দেখেছেন, স্বামীর সহিংসতা নারীর ক্ষমতায়নকে প্রভাবিত করে।

গবেষকেরা মনে করেন, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি থাকলে মানসিক ও যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। চলাচলে স্বাধীনতা থাকলেও শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকি কমে।

মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট মনোয়ারা বলেন, নারীরা এখন গার্মেন্ট ছাড়াও আরও অনেক জায়গায় কাজ করছেন। তবে যেখানেই কাজ করুক না কেন অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ কমাতে হবে। এ জন্য কর্মীদের জ্ঞান বৃদ্ধি এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে।