শিরোনাম

ঢাকা, ১৯ মে, ২০২৬ (বাসস) : অভাবের কারণে শৈশবে বই হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ হয়নি শাবনূরের। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে খুব অল্প বয়সেই ঠেলে দেয় শ্রমজীবনের পথে। কিন্তু প্রতিকূলতা তার স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। দীর্ঘ সময় পর আবারও বর্ণমালার সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব গড়েছেন ৩২ বছর বয়সী এই পোশাক শ্রমিক। সংগ্রামকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি আজ এগিয়ে চলেছেন নতুন আশার আলোকিত পথে।
গাজীপুরের হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেডে কর্মরত শাবনূর বর্তমানে শুধু একজন মেশিন অপারেটরই নন, তিনি একজন স্বপ্নবাজ নারীও। কর্মস্থলের শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে আবার পড়াশোনা শুরু করে নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছেন তিনি।
হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেড তাদের ‘শি ক্যান’ প্রজেক্টের আওতায় নারী শ্রমিকদের জন্য ভিন্নধর্মী এই শিক্ষা উদ্যোগ চালু করেছে। সপ্তাহে দুই দিন কাজের বিরতিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছেন প্রায় ৩৫ জন নারীকর্মী, যারা নানা কারণে একসময় পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েছিলেন।
শাবনূরের জন্ম ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলা সদরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের বড় পরিবারে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবা ছিলেন একজন রিকশাচালক। সংসারের অভাবের কারণে স্কুলে ভর্তি হলেও পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। ছোটবেলাতেই তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
অভাবের তাড়নায় কিশোরী বয়সেই বড় বোনের সঙ্গে ঢাকায় আসেন তিনি। এরপর শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। এর মধ্যেই বিয়ে হয়। ভালো জীবনের আশায় স্বামী বিদেশে গেলেও দুর্ঘটনায় অসুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। তখন পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে শাবনূরের কাঁধে।
সব বাধা পেরিয়ে ২০২০ সালে হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেডে যোগ দেন তিনি। হেলপার হিসেবে শুরু করা শাবনূর আজ দক্ষ মেশিন অপারেটর। শুরুতে তার বেতন ছিল ৯ হাজার ৩০০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এই আয় দিয়েই সংসার, সন্তানের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে চলেছেন তিনি।
তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আবার পড়াশোনা শুরু করার মাধ্যমে। সপ্তাহে দুই দিন, দুই ঘণ্টা করে ক্লাস করেন তিনি। বাংলা, ইংরেজি আর অঙ্কের পাঠ যেন তার সামনে খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। শাবনূর বলেন, ‘অংক একটু কঠিন লাগে, কিন্তু যখন বুঝতে পারি তখন খুব ভালো লাগে। মনে হয়, আমি নতুন একটা জগৎ চিনতে শিখছি।’
তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার আট বছরের মেয়ে হাবিবা আক্তার ইতি। ছোট্ট ইতি স্কুলে পড়ে এবং ছবি আঁকতে ভীষণ ভালোবাসে। রঙ-তুলি আর ক্যানভাসের প্রতি মেয়ের এই ভালোবাসাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখেন শাবনূর। তিনি চান, তার মেয়ে বড় হয়ে একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী হোক এবং উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করুক।
দিনভর কারখানায় কাজের পর ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরেও থেমে থাকেন না তিনি। মেয়ের পাশে বসে আবার বই হাতে তুলে নেন। কখনো মেয়ে তাকে শেখায়, কখনো স্বামী পাশে বসে অজানা শব্দ বুঝিয়ে দেন। মা-মেয়ের একসঙ্গে পড়াশোনার মুহূর্তগুলোই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
আবেগঘন কণ্ঠে শাবনূর বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে যখন আমার মেয়ে বলে—‘আম্মু, আমার সঙ্গে পড়তে বসো।’ তখন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।’ নিজের জন্য তেমন কোনো চাওয়া না থাকলেও মেয়ের স্বপ্ন পূরণে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষা মানুষকে নতুন জীবন গড়ার শক্তি ও সাহস জোগায়।
শাবনূরের এই পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে হপ লুন অ্যাপারেলস লিমিটেডের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন, যার প্রায় ৮০ শতাংশ নারী। কর্মীদের শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বাড়াতে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে চালু করা হয় ‘শি ক্যান’ প্রোগ্রাম।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারীকর্মীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নেতৃত্বের সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্মীদের জন্য নিরাপদ, সহায়ক ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ট্যালেনট্র্যাক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই শিক্ষা কার্যক্রম কর্মীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’
শাবনূরের গল্প শুধু একজন পোশাক শ্রমিকের সংগ্রামের গল্প নয়; এটি হার না মানা এক নারীর নতুন করে স্বপ্ন দেখার গল্প। জীবন তাকে বারবার থামিয়ে দিতে চাইলেও তিনি থামেননি। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের ভেতর থেকেই তিনি মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার আলো খুঁজে নিয়েছেন।