বাসস
  ১৫ মে ২০২৬, ১২:৩৯

নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল প্ল্যাটফর্ম জয়িতা

ঢাকা, ১৫ মে, ২০২৬ (বাসস) : গত এক দশকে বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রযাত্রায় এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সরকারি উদ্যোগ ‘জয়িতা’। আক্ষরিক অর্থে ‘জয়িতা’ মানে সফল নারী বা বিজয়ী নারী। আর বাস্তবেও এটি হয়ে উঠেছে দেশের নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্যের প্রতীক। প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

‘জয়িতা’ মূলত মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীন নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির একটি অংশ। শুরুতে এটি সীমিত পরিসরে চালু হলেও বর্তমানে তা বিস্তৃত হয়ে একটি শক্তিশালী বিপণন ও ব্র্যান্ড প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে। রাজধানীর ধানমন্ডির রাপা প্লাজায় প্রতিষ্ঠিত জয়িতা বিপণন কেন্দ্র দেশের নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে পরিচিত।

জয়িতার মূল শক্তি বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের হাজার হাজার নারী ছোট আকারে ব্যবসা পরিচালনা করলেও তাদের বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ ছিল না। মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতা, বিপণন জ্ঞানের অভাব ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করত। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে ‘জয়িতা’ আত্মপ্রকাশ করে।

মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ১৬ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত মহিলা সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির সদস্যদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছে অসংখ্য নারী উদ্যোক্তা। ‘জয়িতা’ তাদের জন্য একটি সরাসরি বিপণন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে তারা নিজেদের পণ্য ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করে লাভের পূর্ণ অংশ নিজেরাই ভোগ করতে পারেন।

ধানমন্ডির জয়িতা বিপণন কেন্দ্রটি আধুনিক অবকাঠামোর একটি চমৎকার উদাহরণ। এখানে প্রায় ১৩৯টি স্টল রয়েছে, যা বিভিন্ন নারী সমিতির মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্টলগুলোতে হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য এবং দেশীয় খাবারের সমাহার দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে নকশি কাঁথা, জামদানি, গহনা, মাটির তৈরি পণ্য, মধু, আচারসহ নানা ঐতিহ্যবাহী পণ্য। ভবনটির পঞ্চম তলায় রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ, যেখানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়। এছাড়া শিশুদের জন্য একটি চিলড্রেন কর্ণার, উদ্যোক্তাদের জন্য নামাজের ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক অফিসও রয়েছে। এসব সুবিধা জয়িতাকে শুধু একটি বাজার নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জয়িতা পরিচালিত হয় একটি সাধারণ পর্ষদ এবং পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে। নিবন্ধিত মহিলা সমিতিগুলোর সদস্যরা সাধারণ পর্ষদের অংশ হয়ে নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ করেন। পরিচালনা পর্ষদে নির্বাচিত সদস্যদের পাশাপাশি সরকারিভাবে মনোনীত প্রতিনিধিরাও থাকেন, যা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। এছাড়া একটি নির্বাহী পর্ষদ রয়েছে, যারা দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো- জয়িতার ব্র্যান্ড ইমেজ উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক লাভ বৃদ্ধি করা। আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতি অনুসরণ করে পণ্যের মান, গ্রাহকসেবা এবং মূল্য নির্ধারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বর্তমানে ‘জয়িতা’ শুধু একটি বিপণন কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও সক্রিয় হয়েছে। তাদের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি এবং প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে দেশের বাইরে থেকেও ক্রেতারা সহজে পণ্য কিনতে পারছেন। এছাড়া বিভিন্ন জেলায় ‘জয়িতা কর্ণার’ স্থাপন করা হয়েছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনের সুযোগ বাড়িয়েছে। সরকার ভবিষ্যতে আরও জেলা ও উপজেলায় এই উদ্যোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

জয়িতা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক মেলায় অংশ নিয়েছিলেন যশোরের নারী উদ্যোক্তা মরিয়ম নার্গিস। তিনি তার ‘টুইঙ্কেল ক্রাফটসে’র মাধ্যমে তুলে ধরেন যশোর অঞ্চলের প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী হেরিটেজ রিসাইকেল নকশি কাঁথা।

এ বিষয়ে মরিয়ম নার্গিস জানান, আবহমান বাংলার আমাদের পূর্বসূরী নারীদের ব্যবহৃত পুরোনো শাড়ির কাপড় পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে রিসাইকেল করে আমরা এসব নকশি কাঁথা তৈরি করেছি। দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য এসব কাঁথা যেমন ঐতিহ্যের ধারক, তেমনি পরিবেশ সুরক্ষার বার্তাও বহন করে।

আর এসব পণ্যের প্রসারে জয়িতার মেলা বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে। নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও পরিচালিত হচ্ছে। ডিজাইন, প্যাকেজিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর এসব প্রশিক্ষণ তাদের ব্যবসাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। অর্থায়ন ও সহযোগিতা নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জয়িতার সংযোগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করছে। এতে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাচ্ছেন।

‘জয়িতা’ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, সামাজিক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, পরিবারে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ছে এবং সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ নারীরা এখন আর শুধু গৃহিণী হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; তারা উদ্যোক্তা, উপার্জনকারী এবং সমাজের সক্রিয় অংশীদার। এই পরিবর্তন নারী-পুরুষ বৈষম্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের স্বাবলম্বী কারার ক্ষেত্রে যদিও জয়িতা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যেমন-পণ্যের মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং আরও বেশি উদ্যোক্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। ভবিষ্যতে জয়িতাকে একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ‘জয়িতা’ বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি আশার আলো। এটি প্রমাণ করেছে যে, সঠিক সুযোগ ও সহায়তা পেলে নারীরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে জয়িতা ইতোমধ্যেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে।

জয়িতা ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাহিদ মঞ্জুরা আফরোজ বলেন,নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও উদ্যোক্তা বিকাশে জয়িতা ফাউন্ডেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে এলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। জয়িতা বিজয় মেলা নারীদের সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও সাফল্যের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। এজন্য নারীদের প্রশিক্ষণ, বাজার সংযোগ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদারের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সবশেষে বলা যায়, ‘জয়িতা’ শুধু একটি বিপণন কেন্দ্র নয়- এটি একটি আন্দোলন, যা নারীর আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা এবং সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।