বাসস
  ১৪ মে ২০২৬, ১৭:৫১

নিরাপদ মাতৃত্ব নারীর অধিকার

ছবি: ইউনিসেফ

পাবনা, ১৪ মে, ২০২৬ (বাসস): পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার ছোট একটি গ্রাম আগপুঙ্গলী। এ গ্রামেই বাস করেন ১৯ বছর বয়সী শেলী। স্বামী মিন্টু ফকির দিনমজুরির ভিত্তিতে অন্যের জমিতে কৃষি কাজ করেন। মাঝে মধ্যে কৃষি কাজ না থাকলে ভ্যানরিক্সা চালিয়ে থাকেন। দুই বছর আগে একটি কন্যা সন্তান হয়েছে। আবারও সন্তানসম্ভবা। পরিবারের সকলের ইচ্ছা এবার একটি পুত্র সন্তান হবে শেলীর। কিন্তু দুঃখের বিষয় আবারো কন্যা সন্তান। বাড়ির সবারই মন খারাপ। যতই দিন যাচ্ছে শেলীর প্রতি অবহেলার মাত্রা বেড়েই চলছে। অপুষ্টি আর অযতেœ শেলীর শারীরিক অবস্থা দিনদিন খারাপ হতে লাগলো। এক সময় শেলীর প্রসব পরবর্তী জটিলতা দেখা দেয়। শেলীর স্বামী মিন্টু একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু অবহেলা আর অনাদরে আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যায় শেলী। মা হারা হয়ে পড়ে অবুঝ দু’টি শিশু। 

বাল্যবিবাহ আমাদের সমাজে আইনত নিষিদ্ধ হলেও এখন পর্যন্ত গ্রামগঞ্জে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিয়ের বছর পার হতে না হতেই তারা গর্ভবতীও হয়ে পড়ছে। তারপর সে যখন মা হতে যায় তখন তার সংকট দেখা দেয় চারদিক থেকে। গ্রামাঞ্চলে অল্প বয়সি মেয়েদের বিয়ের হার বর্তমানে অনেক বেশী। কারণ তাদের অনেকেই দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। 

গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠির মায়েরা যাতে হাতের কাছে মাতৃস্বাস্থ্য সুবিধা পান সে লক্ষ্যে প্রতি ছয় হাজার জনগোষ্ঠির জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনে উদ্দ্যোগ নেয়া হয়েছে। শহরের বস্তি এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষে চর, হাওর-বাওড় ও পার্বত্য এলাকায় নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্বুদ্ধকরণ ও সেবা কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস ঘোষণা করেন এবং ১৯৯৮ সাল থেকে দেশব্যাপি ’নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালন শুরু হয়েছে। দিবসটিতে- মানসম্মত গর্ভকালীন সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং নারীর স্বাস্থ্য অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। 

বিবিএস-এর ২০২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৮ জন ছিল। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ জনে। একইভাবে এ সময়ের মধ্যে এক বছরের কম বয়সি শিশুর মৃত্যু প্রতি হাজারে ২২ থেকে বেড়ে দাড়িয়েছে ২৫ জনে। ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে ১২৩ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। 

প্রসবকালীন যতœ ছাড়াও প্রসব পরবর্তী জরুরি কিছু যতœ আছে যা প্রসুতি মা ও সন্তানের সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন। যেমন- মাকে সর্বদা পরিস্কার রাখা, মায়ের জন্য পর্যাপ্ত সুষম খাবার, বিশ্রাম ও যতেœর ব্যবস্থা করা। শিশুর নাভীর যতœ, শিশুর টিকা ও শিশুর খাবার হিসাবে মায়ের দুখ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। ইসলামে প্রসূতি ও নবজাতকের জীবন রক্ষার জন্য জোরালো তাগিদ দেয়া হয়েছে। মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষার অভাব ও ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা প্রতিবছর সন্তান ধারণ করে থাকেন। এ কারণে শিশুর সঠিক পরিচর্যা না হওয়ায় পুষ্টিহীন ও রোগাক্রান্ত মা ও শিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।  

পরিবারে নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মাকে পুর্ণ বিশ্রামে থাকতে হয়। তাকে ভারী ও কঠিন কাজ না দিয়ে তার কষ্ঠ লাঘব করা যায়। ঘন ঘন সন্তান প্রসব থেকে বিরত রাখার জন্য মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এগিয়ে এসে জনগণকে সচেতন করতে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে। যেসব মা স্বাস্থ্য সেবা পান না তাদের কাছে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে। প্রসূতির প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনা সেবা আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও এর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তাই প্রসূতির নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকার ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের আপামর জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করে প্রসূতিকে সুস্থ রাখতে পারলে নবজাতকেরা সুস্থ থাকবে এবং গড়ে উঠবে একটি সুস্থ জাতি।