বাসস
  ১১ মে ২০২৬, ১১:০৫

সঠিক চিকিৎসায় শিশুর খিঁচুনি বা মৃগী রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব 

প্রতীকী ছবি

ঢাকা, ১১ মে, ২০২৬ (বাসস):  চৈতালির (ছদ্মনাম) বয়স তখন মাত্র সাড়ে তিন বছর। শরীরে তার প্রথম খিঁচুনি শুরু হয়। তখন সে খেলছিল। সেদিন ছিল দুপুর বেলা। ওই সময়েই খেলতে খেলতে তার খিঁচুনি শুরু হয়। প্রথমে তার মা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না যে তার মেয়ের এমন আচরণ কেন করছে? নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। 

ডাক্তার চৈতালিকে দেখেই বললেন, তার খিঁচুনি বা মৃগী রোগ হয়েছে। তারপর ডাক্তারের পরামর্শে তাড়াহুড়ো করে বাসার কাছেই রাজধানীর গ্রিন রোড এলাকার একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গেলেন। চিকিৎসা দেওয়ার পরও একদিন ক্লিনিকে ভর্তি রাখা হয়। 

এরপর আরো বেশ কয়েকবার খিঁচুনি হয় চৈতালির। এখনো তার চিকিৎসা চলছে।
 
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুর রহমান বলেন, মৃগী রোগ বললেই খিঁচুনির দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রাস্তাঘাটে এ রকম অনেক খিঁচুনি রোগীকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেকে অজ্ঞতাবশত তাদের নাকে জুতা, মোজা চেপে ধরেন। কিন্তু এরা যে জটিল মস্তিষ্কের সমস্যায় ভুগছেন, তা হয়ত অনেকেই জানি না। তাই বলে কি খিঁচুনি মানেই মৃগী রোগ? না, মোটেও তা নয়।
 
তিনি বলেন, নানাবিধ কারণে শিশুদের খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। খিঁচুনি সাধারণত মস্তিষ্কের জটিল কোনো অসুখের লক্ষণ। জন্মের পর থেকে যে কোনো সময় খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। জন্মের পরে প্রথম দিনে রক্তে সুগার কমে গিয়ে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। মস্তিস্কে অক্সিজেনের অভাব হলে দ্বিতীয় দিনে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। প্রথম সপ্তাহে খিঁচুনি হয়ে থাকে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ বা ইনফেকশনের জন্য। এছাড়া, শিশুর বয়স এক মাসের মধ্যে মস্তিষ্কের বৈকল্য বা বিপাকীয় জটিলতার কারণে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। নবজাতকের খিঁচুনি একটু অন্যরকম হয়ে থাকে। যেমন হঠাৎ কিছু সময়ের জন্য স্বাভাবিক নড়াচড়া বন্ধ থাকে অথবা শরীরের কোনো অংশে ঝাঁকুনি হয়ে থাকে অথবা শ্বাস বন্ধ রাখে। শিশুদের এক ধরনের ঝাঁকুনিকে খিঁচুনি বলে মনে হতে পারে। খেয়াল করলে এটি সহজে আলাদা করা যায়। সাধারণ খিঁচুনি হাত দিয়ে ধরলে থেমে যায়, চিকিৎসার দরকার হয় না।
 
শিশু নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী আশরাফ বলেন, শিশুর এক বছর বয়সের মধ্যে নানা কারণে খিঁচুনি হতে পারে। এর মধ্যে ইনফেন্টাইল স্পাজমের বিশেষ চিকিৎসা দরকার হয়। ৬ মাস থেকে ৬ বছর বয়সের শিশুদের সাধারণ জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি দেখা দেয়, তাকে জ্বরজনিত খিঁচুনি বলে। সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে জ্বরজনিত খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বয়স বাড়লে এ খিঁচুনি ভালো হয়ে যায়। জ্বরজনিত খিঁচুনি সাধারণত মস্তিষ্কে বাইরের কোনো ইনফেকশনের জন্য হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ইনফেকশন যেমন মেনিনজাইটিস বা এনকেফালাইটিসের সম্পৃক্ততা নেই, সেটা বোঝা জরুরি। সে ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে রোগীর বিশেষ কিছু পরীক্ষা করে নিতে হয়।
 
নবজাতকের খিঁচুনি সাময়িক চিকিৎসায় ভালো হয়। অল্পসংখ্যক বাচ্চার নিয়মিত ওষুধের দরকার হয়। এপিলেপ্সি বা মৃগী রোগজনিত খিঁচুনির জন্য দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন করতে হয়। পারিপার্শ্বিক কারণ ছাড়াই বারবার খিঁচুনি হলে তাকে মৃগী রোগ বা এপিলেপ্সি বলে। ৭০-৮০ শতাংশ মৃগী রোগীর খিঁচুনি পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হয়। খিঁচুনির চিকিৎসা বয়স ও লক্ষণ অনুযায়ী করতে হয়। লক্ষণ অনুযায়ী মৃগী রোগ সাধারণত দুই ধরনের। যেমন- খিঁচুনি, শরীরের যে কোনো এক অংশে হয় ফোকাল সিজার, আর সারা শরীরে হয় জেনারেলাইজড সিজার।
 
লক্ষণ ও বয়স অনুযায়ী সঠিক ওষুধ নির্বাচন করে সর্বনিম্ন মাত্রায় শুরু করে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে বাড়াতে হয়। সাধারণ ওষুধের দ্বারা নিরাময় না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়। যেমন কিটোজেনিক ডায়েট, এপিলেপ্সি সার্জারি। ওষুধ চলা অবস্থায় ৩-৬ মাস পর রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। যে কোনো অবস্থায় ৫ মিনিটের বেশি খিঁচুনি স্থায়ী হলে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিতে হবে। শুধু খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণই এপিলেপ্সির একমাত্র চিকিৎসা নয়। এপিলেপ্সি রোগীর খিঁচুনির পাশাপাশি আনুষঙ্গিক বিষয় যেমন- হাঁটাচলা, কথা বলা, বুদ্ধিবৃত্তি ইত্যাদির প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। খিঁচুনি নিয়ন্ত্রিত থাকলে এপিলেপ্সি রোগী পড়াশোনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সব কাজ স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে যেতে পারে।