শিরোনাম

ঢাকা, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : রংপুর নগরের সাতমাথা বীর ভদ্র রেলগেট এলাকার এক সাধারণ গৃহবধূ—সানজিদা আখতার। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, দারিদ্র্য আর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। সুই-সুতা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বদলে দিয়েছেন অর্ধশতাধিক নারীর জীবনও।
অন্ধকার থেকে আলোর পথে
২০১৭ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভালোবেসে স্থানীয় যুবক ওসমান গণিকে বিয়ে করেন সানজিদা। বিয়ের পরের সময়টা সুখের হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তাদের সংসারে নেমে আসে দুর্ভাগ্যের ছায়া। বিয়ের ছয় মাসের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সানজিদা। অন্যদিকে, ওসমান গণির ছোট কাপড়ের ব্যবসাটিও বন্ধ হয়ে যায়।
স্ত্রীর চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে পুঁজি হারিয়ে ফেলেন ওসমান। বাধ্য হয়ে তিনি টাইলস মিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। সেই সময়টায় পাশে দাঁড়ানোর মতো তেমন কেউ ছিল না,—না শ্বশুরবাড়ি, না বাবার বাড়ি। চরম অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটছিল তাদের।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সানজিদা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি ভাবতাম, ঘরে বসে কিছু একটা করতে হবে। শুধু স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।’
ইউটিউব থেকে শেখা, স্বপ্নের শুরু
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনাকাল ছিল তাদের জীবনের মোড় ঘোরানোর সময়। স্বামী কিস্তিতে একটি স্মার্টফোন কিনে দেন সানজিদাকে। সেই ফোনই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সহায়ক।
ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে সুতি কাপড়ে সুই-সুতার নকশা করার কাজ তার ভালো লাগে। ধীরে ধীরে তিনি নিজেই শেখা শুরু করেন। প্রথমে নিজের স্বামীর জন্য হাতে সেলাই করা নকশার একটি পাঞ্জাবি তৈরি করেন।
সেই পাঞ্জাবি দেখে আশপাশের মানুষের প্রশংসা তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। তখনই মাথায় আসে এই কাজ দিয়েই কিছু করা সম্ভব।
‘হাতের ছোঁয়া’র যাত্রা
২০২১ সালে সানজিদা ফেসবুকে ‘হাতের ছোঁয়া’ নামে একটি পেজ চালু করেন। প্রায় ১০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে কাপড়, সুই-সুতাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে শুরু করেন তার উদ্যোক্তা জীবন।
শুরুর দিনগুলো ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি। নিজের হাতে নকশা করা জামা, পাঞ্জাবি, ফতুয়া সবকিছুই ধীরে ধীরে ক্রেতাদের নজর কাড়তে শুরু করে।
প্রতারণা, লোকসান ও নতুন করে শুরু
ব্যবসার শুরুতেই বড় ধাক্কা খেতে হয় সানজিদাকে। ইতালি প্রবাসী এক নারী তার কাছ থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকার পণ্যের অর্ডার দেন। কিন্তু এক আত্মীয়ের মাধ্যমে নিম্নমানের কাপড় সরবরাহ হওয়ায় পুরো অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। এতে প্রায় ৪৫ হাজার টাকার লোকসান হয় তার।
এই অভিজ্ঞতা তাকে ভেঙে না ফেলে বরং আরও দৃঢ় করে তোলে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন-এবার থেকে সবকিছু নিজের তত্ত্বাবধানে করবেন।
২০২৩ সালে নতুনভাবে কাজ শুরু করেন। ইউটিউব থেকে আরও উন্নত নকশা ও সেলাইয়ের কৌশল শিখে তিনি তার কাজের মান বাড়ান।
অনলাইনে জনপ্রিয়তা
‘হাতের ছোঁয়া’ পেজের মাধ্যমে সানজিদার পণ্য দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে থাকে অর্ডার।
ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড নকশা তৈরি করাই তার বিশেষত্ব। প্রতিটি পণ্যে থাকে যত্ন আর ভালোবাসার ছোঁয়া, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
বদলে যাওয়া জীবন
একসময় যাদের সংসারে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী, আজ সেই পরিবারে স্বচ্ছলতার ছোঁয়া। সানজিদার মাসিক আয় এখন ৩০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়।
স্বামী ওসমান গণিও এখন তার পাশে থেকে কাজ করছেন। কাপড় সংগ্রহ, লন্ড্রি, প্যাকেজিং ও কুরিয়ার-সবকিছুতেই তিনি সহযোগিতা করেন।
ওসমান বলেন, ‘আগে গ্রামের মানুষ হাসত। এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ কাজ শিখতে আসে। এটা আমাদের জন্য গর্বের।’
নারীদের কর্মসংস্থানের দিগন্ত
সানজিদার এই উদ্যোগ শুধু তার নিজের পরিবারেই সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে তার সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন অর্ধশতাধিক নারী। এদের মধ্যে অনেকেই গৃহিণী, কেউ বা শিক্ষার্থী। সংসারের কাজের ফাঁকে সুই-সুতার কাজ করে তারা বাড়তি আয় করছেন।
একজন নারী মাসে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছেন, যা তাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।
সানজিদার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ১০ থেকে ১২ জন নারী ও কিশোরী একসঙ্গে বসে কাপড়ে নকশা তোলার কাজ করছেন, যেন এক টুকরো স্বপ্ন বুনছে তারা।
সমাজে ইতিবাচক প্রভাব
প্রতিবেশী আবুল হাশেম বলেন, ‘এক সময় তাদের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এখন শুধু নিজেরাই ভালো নেই, অন্যদেরও কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। এটা সবার জন্যই আনন্দের।’
এই উদ্যোগ গ্রামের নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। তারা বুঝতে পারছে ঘরে বসেও সম্মানজনকভাবে আয় করা সম্ভব।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
সানজিদার স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান তার এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে, যাতে আরও বেশি নারী কাজের সুযোগ পান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে একসময় হতাশ ছিলাম। এখন অন্য নারীদের জন্য কিছু করতে পারছি-এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’
সরকারি সহায়তার সম্ভাবনা
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, রংপুর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সেলোয়ারা বেগম এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সানজিদা ও তার সঙ্গে যুক্ত নারীদের প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া ইতোমধ্যে আমরা জেলায় এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
এক অনুপ্রেরণার গল্প
সানজিদা আখতারের গল্প শুধু একজন নারীর সফলতার গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, সাহস আর স্বপ্নের গল্প। সীমিত সম্পদ, প্রতিকূলতা আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কীভাবে একজন নারী নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন-তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি।
সুই-সুতার সূক্ষ্ম বুননে তিনি শুধু কাপড়েই নকশা আঁকেননি, এঁকেছেন জীবনের নতুন মানচিত্র-যেখানে আছে আশা, আত্মবিশ্বাস আর সম্ভাবনার অসীম দিগন্ত। আর এভাবেই সানজিদারা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবেন।