শিরোনাম

ঢাকা, ২৫ এপ্রিল, ২০২৫ (বাসস) : ঝালকাঠির এক সাধারণ গৃহিণী থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা কল্পনা রানীর গল্প যা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয় বরং সমাজে নারীর অগ্রযাত্রার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ প্রায় কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তার এই পথচলা যেমন সংগ্রামের, তেমনি অধ্যবসায়, সাহস ও দৃঢ় সংকল্পের অনন্য উদাহরণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। নানা প্রতিকূলতা, সামাজিক বাধা ও পারিবারিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অনেক নারী আজ উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। কল্পনা রানীর গল্প সেই পরিবর্তনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তিনি শুধু নিজেকে স্বাবলম্বী করেছেন তা নয়, বরং আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
সম্প্রতি ঝালকাঠি শহরে ‘স্বর্ণা প্যাকেজিং’-এ বসে নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার কথা বলছিলেন তিনি। জানালেন, প্রায় ২০ বছর আগে সংসারের অভাব-অনটন দূর করার তাগিদ থেকেই কল্পনা রানী উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন তার হাতে ছিল না বড় কোনো পুঁজি বা ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা। স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে ঘরে বসেই শুরু করেন কাগজের প্যাকেট তৈরির কাজ। শুরুটা ছিল খুবই ছোট পরিসরে। নিজের হাতে প্যাকেট করে সেটা নিজেই দোকানে দোকানে ঘুরে বিক্রি করতেন তিনি।
‘শুরুর দিনগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। সমাজের অনেকেই আমার এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দেননি। অনেকে মনে করতেন, এই ধরনের কাজ করে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিরলস পরিশ্রম চালিয়ে গেছি। আর এই দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসই আমাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে,’ বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছিলেন চালশে কল্পনা রানী।
ব্যবসায়িক সঙ্গী স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেও ভুলেননি তিনি। বলেন, এই পথচলায় বড় ভূমিকা রেখেছেন স্বামী বিমল দেবনাথ। শুরু থেকেই তিনি আমাকে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন। পারিবারিক এই সমর্থন আমাকে আরও এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। ধীরে ধীরে আমার কাজের পরিধি বাড়তে থাকে এবং ছোট উদ্যোগটি রূপ নিতে শুরু করে একটি সংগঠিত ব্যবসায়।

বর্তমানে ঝালকাঠি শহরের কলেজ রোড এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে গড়ে তুলেছে তার প্যাকেজিং কারখানা, যার নাম ‘স্বর্ণা প্যাকেজিং’। ছোট মেয়ের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন তিনি। এখানে বিভিন্ন ধরনের কাগজের প্যাকেট তৈরি করা হয় যা মূলত খাবার প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়- বিশেষ করে বিরিয়ানি, মিষ্টি ও অন্যান্য খাবারের জন্য।
এই কারখানায় আধা কেজি, এক কেজি, দেড় কেজি ও দুই কেজি ধারণক্ষমতার বিভিন্ন ধরনের প্যাকেট তৈরি করা হয়। উৎপাদিত পণ্য শুধু ঝালকাঠির চারটি উপজেলাতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং আশপাশের জেলা যেমন বরগুনা ও পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও সরবরাহ করা হয়।
কল্পনার স্বামী বিমল জানান, বর্তমানে বামনা, বেতাগী, ভান্ডারিয়া ও নৈকাঠি অঞ্চলের অনেক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও নিয়মিত আমাদের তৈরি প্যাকেট যায়।
প্যাকেট তৈরির প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্যাকেট তৈরির প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে বড় কাগজ নির্দিষ্ট মাপে কাটা হয়। এরপর কাটিং প্রেস মেশিন দিয়ে তা ছাঁটা হয়। তারপর ভাঁজ, আঠা এবং স্টেপলার ব্যবহার করে প্যাকেট তৈরি করা হয়। কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত কাগজ সংগ্রহ করা হয় মূলত বরিশাল ও ঢাকার কাগজ কোম্পানি থেকে। বাজারে এসব প্যাকেট ৪ টাকা থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়।
বর্তমানে ‘স্বর্ণা প্যাকেজিং’ কারখানায় একটি কাটিং মেশিন এবং একটি রোলার মেশিন রয়েছে। এই মেশিনগুলো ব্যবহার করেই উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কারখানাটিতে বর্তমানে ছয়জন নারী সরাসরি কাজ করেন। এছাড়া আরও পাঁচজন নারী বাসায় বসে প্যাকেট তৈরির কাজ করেন। পাশাপাশি তিনজন পুরুষ শ্রমিকও এখানে নিয়োজিত রয়েছেন।
কল্পনা রানীর এই উদ্যোগ শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারীদের অনেকেই আগে কর্মহীন ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বামী পরিত্যক্ত বা পারিবারিকভাবে অসচ্ছল। এখন তারা প্রতিদিন কাজ করে প্রায় ৫০০ টাকা আয় করছেন যা তাদের পরিবার চালাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কল্পনা রানী এই প্রতিবেদককে জানান, নারীদের জন্য কিছু করতে পারাটা তার কাছে গর্বের বিষয়। তিনি চেষ্টা করেন, যারা কাজ খুঁজছেন তাদের সুযোগ দিতে। এতে তারা নিজেরাও আয় করতে পারছেন এবং পরিবারের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করতে পারছেন।
কল্পনার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সীমা দেবনাথ বলেন, এখানে কাজ করে আমরা উপকৃত হচ্ছি। প্রতিদিন কাজ করলে প্রায় ৫০০ টাকা আয় হয় যা সংসারের খরচ চালাতে সাহায্য করে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান লিপি আক্তার; যিনি বিবাহ বিচ্ছেদের পর জীবিকা সংকটে ছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়ার পর তিনি এখন নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারছেন।
আরেক কর্মী মিতালি রানী বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমস্যার মধ্যেও এই কাজ তাদের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে। ঘরের কাজ শেষ করে কারখানায় এসে কাজ করেন, এতে নিয়মিত কিছু আয় হয়। তিনি কল্পনা রানীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, কারণ তার উদ্যোগই তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ ২০ বছরের পরিশ্রমে কল্পনা রানীর ব্যবসার লেনদেন এখন প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এই সাফল্যের মাঝেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে যে ভাড়া বাড়িতে কারখানাটি চলছে, সেটির অবস্থা খুব ভালো নয়। নিচু জায়গায় হওয়ায় বৃষ্টি হলে পানি জমে যায়, ফলে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি জানান, আবাসিক এলাকায় সহজে ভাড়া পাওয়া যায় না, ফলে উপযুক্ত জায়গার অভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদি একটি ভালো ও নিরাপদ জায়গা পাওয়া যেত, তাহলে কাজের পরিবেশ আরও উন্নত হতো এবং উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতো।
এছাড়া আধুনিক মেশিনের অভাবও তার ব্যবসার সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি আধুনিক মেশিন কিনতে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা প্রয়োজন, যা তার পক্ষে বর্তমানে সংগ্রহ করা কঠিন। এই মেশিন পেলে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হতো এবং আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা যেত।
এতদিনের ব্যবসায়িক যাত্রায় তিনি কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। মূলত বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েই তার ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়েছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সহায়তা প্রদান করে, তাহলে তারা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারবেন।
বিশেষ করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিসিক শিল্প এলাকায় একটি প্লট পাওয়ার আশা করছেন তিনি। সেখানে স্থায়ীভাবে কারখানা স্থাপন করতে পারলে আধুনিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তার লক্ষ্য, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা ও আরও বেশি নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
স্থানীয় বাসিন্দা কবিতা হালদার বলেন, কল্পনা রানীর মতো উদ্যোক্তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন। তারা অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছেন এবং প্রমাণ করছেন যে ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে সফল হওয়া সম্ভব।
ঝালকাঠি জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দিলারা খানমের ভাষ্য, নারীরা এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছেন এবং সরকার তাদের দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কল্পনা রানীর মতো উদ্যোক্তারা এই অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করছেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট বরাদ্দের সুযোগ রয়েছে জানিয়ে ঝালকাঠি বিসিক-এর উপ-পরিচালক মো. আল আমিন বলেন, এ জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করলে তা বিবেচনা করা হয়। নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে বিসিক বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে থাকে।
সব মিলিয়ে, কল্পনা রানীর গল্প শুধু একজন নারীর সফলতার কাহিনি নয়— এটি একটি সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি যা দেখায় কীভাবে সীমিত সম্পদ নিয়েও বড় স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব। তার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও অনেক নারীর জীবনে পরিবর্তন আনবে— এমনটাই প্রত্যাশা।