শিরোনাম

দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ
কুমিল্লা, ২২ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : কুমিল্লার পদুয়ায় ভয়াবহ বাস-রেল সংঘর্ষে স্ত্রী ও দুই কন্যাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বাসচালক পিন্টু মিয়া। জীবিকার জন্য যে পেশায় প্রতিদিন মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতেন, সেই পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকা এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিজের পরিবারকে হারিয়ে এখন তিনি বাকরুদ্ধ ও শোকে স্তব্ধ।
ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার বাসিন্দা পিন্টু মিয়া ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মানিকদীতে পরিবারসহ বসবাস করতেন। পেশায় তিনি ‘মামুন স্পেশাল’ পরিবহনের একজন চালক। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যান। আনন্দমুখর পরিবেশে কাটানো ঈদের দিনই তার জীবনে চরম শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঈদের দিন বিকেলে স্ত্রী লাইজু আক্তার এবং দুই কন্যা-ছয় বছর বয়সী খাদিজা আক্তার ও সাড়ে তিন বছরের মরিয়ম আক্তারকে শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরের হাজিরহাটে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল’ পরিবহনের একটি বাসে যাত্রা শুরু করেন।
তবে পিন্টু মিয়া নিজে ওই বাসে ছিলেন না। সৌদি আরব থেকে আগত তার শ্যালককে আনতে ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি স্ত্রী-সন্তানদের বাসে তুলে দিয়ে নিজে ঢাকায় নেমে যান। সহকর্মী চালকের কাছে পরিবারের সদস্যদের দেখভালের অনুরোধ করে তিনি আলাদা পথে রওনা হন। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়।
পিন্টু মিয়া জানান, যাত্রাপথে সহকর্মীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন তিনি। স্ত্রী-সন্তানদের খোঁজখবরও নিচ্ছিলেন। সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও গভীর রাতে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি।
এরপর রোববার ভোরে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড সংলগ্ন জাঙ্গালিয়া রেলক্রসিং এলাকায় ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ঢাকাগামী ‘চট্টগ্রাম মেইল’ ট্রেনের সঙ্গে নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরগামী যাত্রীবাহী বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও কয়েকজন।
নিহতদের তালিকায় পিন্টু মিয়ার স্ত্রী ও দুই কন্যার নামও নিশ্চিত করা হয়। খবরটি পাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং দ্রুত কুমিল্লায় ছুটে আসেন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে স্বজনদের আহাজারির মধ্যেই তিনি নির্বাক অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরিবারের তিন সদস্যের মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায় থাকা পিন্টু মিয়ার অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোকাবহ। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকে তিনি প্রায় কথা বলতে পারছেন না।
পিন্টু মিয়া বলেন, তিনি বেঁচে থাকলেও তার জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তার স্ত্রী ও সন্তানরাই ছিল তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন।
এ দুর্ঘটনায় একাধিক পরিবার স্বজন হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ রেলক্রসিংগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের দাবিও উঠেছে।
উল্লেখ্য, দুর্ঘটনার পর কিছু সময়ের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে উদ্ধার তৎপরতা শেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।