বাসস
  ১১ মার্চ ২০২৬, ১৬:২৭

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ম্যালেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন শনাক্তে গবেষণা শুরু

ঢাকা, ১১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথমবারের মতো ম্যালেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন শনাক্তের লক্ষ্যে একটি জোরদার গবেষণা শুরু করেছে আইসিডিডিআর,বি। 

বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পরিচালিত এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে; যখন প্রতিবেশী মিয়ানমারে ম্যালেরিয়া পরজীবীর ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন ছড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওষুধ-প্রতিরোধী পরজীবীর বিস্তার ঘটলে বাংলাদেশের ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হতে পারে।

ম্যালেরিয়া একটি প্রাণঘাতী রোগ; যা মশার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এর সবচেয়ে মারাত্মক ধরন হলো প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম। বর্তমানে এই ধরনের ম্যালেরিয়ার রোগীরা কার্যকর ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে পারেন। তবে পরজীবীর মধ্যে ওষুধ-প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য তৈরি হলে চিকিৎসার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের প্রচেষ্টায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলায় মঙ্গলবার কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) ক্যাম্পকেন্দ্রিক সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং ম্যালেরিয়া নজরদারি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

গবেষণাটি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পরিচালিত হবে; যেখানে ম্যালেরিয়ার ওষুধ-প্রতিরোধী ধরন ছড়িয়ে পড়ার কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ রয়েছে। ক্যাম্পগুলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত এবং সীমান্ত পারাপার, ঘনবসতি ও সীমিত নজরদারি ব্যবস্থার কারণে পরজীবীর বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী আশ্রয়স্থলগুলোর একটি। মোট ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।

ব্র্যাক-এর হালনাগাদ নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, শিবিরগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ম্যালেরিয়া পরীক্ষা ও শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ছিল ৭ জন, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯১ জনে। যদিও মোট সংখ্যা এখনও তুলনামূলকভাবে কম; তবুও এই প্রবণতা ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও সম্ভাব্য ওষুধ-প্রতিরোধ দ্রুত শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

শিবিরগুলোতে শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ সংক্রমণই প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম দ্বারা সৃষ্ট; যা ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক ধরন এবং ওষুধ-প্রতিরোধের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত। নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণের সঙ্গে ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকা যেমন বান্দরবান জেলায় ভ্রমণ বা মিয়ানমার সীমান্ত পারাপারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে অব্যাহত সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা গেলে শরণার্থী ও স্থানীয় উভয় জনগোষ্ঠীকেই সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে এবং ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা কার্যকর রাখা যাবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি এবং ব্র্যাকের সহযোগিতায় আইসিডিডিআর,বি এই গবেষণা পরিচালনা করবে। গবেষণাটি অর্থায়ন করছে গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা। চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে রোগী অন্তর্ভুক্ত করা শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গবেষণার আওতায় নির্বাচিত ক্যাম্প এবং নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ম্যালেরিয়া রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। রোগীদের কাছ থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরজীবীর জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হবে; যাতে আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক সমন্বিত চিকিৎসা (এসিটি)-এর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য প্রতিরোধের লক্ষণ শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি চিকিৎসার পর রোগীর রক্ত থেকে কত দ্রুত পরজীবী দূর হয়; তাও পর্যবেক্ষণ করা হবে।

আইসিডিডিআর,বি-এর বিজ্ঞানী ডা. মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া সময়মতো শনাক্ত না হলে তা অজান্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রতিরোধের প্রাথমিক লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রমাণভিত্তিক তথ্য তৈরি করা বাংলাদেশের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অগ্রগতি ধরে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ম্যালেরিয়া-প্রবণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা বা অবসাদ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সময়মতো পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ণমাত্রায় ওষুধ সেবন করলে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে তারা জানান।

বাংলাদেশের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কৌশল (২০২৪-২০৩০) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী নজরদারি এবং সম্ভাব্য ওষুধ-প্রতিরোধ দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।