শিরোনাম

\ জাহিদুল খান সৌরভ \
শেরপুর, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলা। এই জেলা শহরের বুকে আড়াইশ’ বছরের ইতিহাস নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মাইসাহেবা জামে মসজিদ। সময়ের ঝড়-ঝাপটা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা অধ্যায় অতিক্রম করেও এটি আজও অটুট ধর্মীয় চেতনা, স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও নামকরণ:
ঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় ২৫০ বছর আগে আঠারো শতকের শেষভাগে মসজিদটি নির্মিত হয়। সে সময় অঞ্চলটি ছিল নদী-নালাবেষ্টিত ও কৃষিনির্ভর। ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সংহতির কেন্দ্র হিসেবে একটি স্থায়ী ইবাদতখানার প্রয়োজনীয়তা থেকেই মসজিদটির প্রতিষ্ঠা।
মসজিদের নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনী। কথিত আছে, প্রায় আড়াইশ’ বছর আগে শেরপুরের তৎকালীন তিনআনি জমিদার মুক্তাগাছার জমিদারকে দাওয়াত করেন। দাওয়াতে সাড়া দিয়ে মুক্তাগাছার জমিদার শেরপুরে আসেন। এরপর মুক্তাগাছার জমিদার শেরপুরের একটি স্থানে বিশ্রাম নেন। যেখানে তিনি বিশ্রাম করেন, সেই স্থানে জমিদারের খাজনা আদায়ের ঘর ছিল। পরবর্তীতে বিশ্রামের জায়গাটি মুক্তাগাছার জমিদারের পছন্দ হয় এবং জায়গাটি তিনি শেরপুরের জমিদারকে নিজ নামে লিখে দিতে অনুরোধ করেন। মুক্তাগাছার জমিদারের অনুরোধ রাখেন শেরপুরের তিনআনি জমিদার। দাওয়াত শেষে নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার আগে মুক্তাগাছার জমিদার চিন্তা করেন, সেই জায়গাটি কোনো মুসলিম সাধককে লিখে দিবেন।
ঠিক সে সময় মীর আব্দুল বাকী নামে একজন ইসলাম ধর্ম প্রচারকের খোঁজ মিলে। কিন্তু সেই ধর্ম প্রচারক জানান, তার সম্পূর্ণ জায়গার দরকার নেই। যতটুকু জায়গা মসজিদ নির্মাণে প্রয়োজন তার ততটুকুই তিনি গ্রহণ করবেন।
এরপর মুসলিম সাধকের অনুরোধে তাকে মসজিদ নির্মাণের জন্য জায়গাটি লিখে দেয়া হয়।
১৮৬১ খ্রীস্টাব্দে সেই ধর্ম প্রচারক এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলাম প্রচারক মীর আব্দুল বাকীর মত্যুর পর তার স্ত্রী সালেমুন নেছা বিবি মসজিদের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করেন। সে সময় আল্লাহর ধ্যানে সর্বদা মগ্ন ওই সালেমুন নেছাকে সবাই ‘মা’ বলে ডাকতেন।
ঐ ‘মা’ থেকেই মসজিদটির নামকরণ করা হয় ‘মাইসাহেবা জামে মসজিদ’। সালেমুন নেছার মৃত্যুর পর তার ভাগনে সৈয়দ আবদুল আলীর ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। মসজিদটি শেরপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র বাগরাকশা শেরপুর সরকারি কলেজের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। এছাড়া শেরপুর জামালপুর বাসস্ট্যান্ড থেকেও ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটির দূরত্ব কম।
ব্রিটিশ শাসনামল, পাকিস্তান পর্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশ-তিনটি যুগ অতিক্রম করেও মসজিদটি স্থানীয় মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে।
স্থাপত্যশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্য:
মাইসাহেবা জামে মসজিদে মুঘল স্থাপত্যরীতির নিদর্শন লক্ষণীয়। এছাড়া মসজিদটিতে স্থানীয় কারিগরদের স্বকীয়তার ছাপও রয়েছে।
গম্বুজ ও কাঠামো:
মসজিদের মূল কাঠামো আয়তাকার। উপরে রয়েছে একাধিক অর্ধগোলাকৃতি গম্বুজ। যা স্থাপনাটিকে রাজকীয় আবহ প্রদান করেছে। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি তুলনামূলক বড়। পাশে ছোট গম্বুজ ভারসাম্য রক্ষা করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে।
খিলানযুক্ত দরজা ও জানালা:
মসজিদটির প্রবেশপথে রয়েছে নান্দনিক খিলান। দরজা ও জানালায় বাঁকানো নকশা মুঘল আমলের শিল্পরুচির পরিচয় বহন করে।
পুরু দেয়াল ও নির্মাণ উপাদান এবং বৈশিষ্ট্য:
মসজিদের দেয়াল অনেক পুরু, যা প্রাচীন নির্মাণশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পোড়া ইট ও চুন-সুরকির মিশ্রণে নির্মিত দেয়াল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে। মসজিদের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে হুজরাখানা বা মুয়াজ্জিন কক্ষ। অজুর জন্য রয়েছে দু‘টি আলাদা স্থান।একটি মসজিদের দক্ষিণ পাশে অন্যটি উত্তর পাশে। যেখানে ২ শতাধিক মুসুল্লি একসঙ্গে অযু করতে পারেন। পবিত্রতা অর্জনের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। বিশাল এই মসজিদের সামনের অংশে রয়েছে খালি মাঠ। এখানে প্রতি বছর দু‘টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতি শুক্রবারে মসজিদের দানবাক্স থেকে ২ থেকে ৩ লক্ষ টাকা পাওয়া যায়।
নিরাপত্তা:
মসজিদের চারপাশ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতাভুক্ত। পুরো মসজিদ পাহারা দেয়ার জন্য দুইজন লোক নিয়োজিত রয়েছে। একজন মসজিদ কর্তৃপক্ষের, অন্যজন পৌর কর্তৃপক্ষের।
ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব:
শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়, মাইসাহেবা মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের কাছে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবারের জুমার নামাজে মসজিদে জেলা শহরের বাইরে থেকে হাজার হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করার জন্য আসেন। এদিন সবাই মিলেমিশে দেশ ও গোটা মুসলিম জাতির জন্য বিশেষ দোয়া করে থাকেন। এই মসজিদে রমজানের মাসের প্রতিদিন প্রায় ৪শ’ থেকে ৫শ’ মুসল্লী ইফতার করে থাকেন।
পবিত্র রমজানে তারাবি ও কোরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি স্থানীয় শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়া ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় বৃহৎ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
সংরক্ষণ ও চ্যালেঞ্জ:
দীর্ঘ সময় ধরে মসজিদের অনেক অংশ সংস্কার করা হয়েছে। তবে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ গবেষণা ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে এটি জাতীয়ভাবে ঐতিহ্যের মর্যাদা পেতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এছাড়া স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, মসজিদটিকে ঘিরে পর্যটন সম্ভাবনাও রয়েছে, যা শেরপুরের সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
মূলকথা:
আড়াইশ’ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শেরপুরের মাইসাহেবা জামে মসজিদ কেবল একটি স্থাপনা নয়। এটি শেরপুরের ইতিহাস, ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর দেয়াল আজও অতীতের গল্প বলে। মাইসাহেবা জামে মসজিদ তাই কেবল শেরপুরের গর্ব নয় বরং বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের এক মূল্যবান সম্পদ।
শেরপুর জেলাবাসী মনে করে, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সবার দায়িত্ব।