শিরোনাম

ফারাজী আহম্মদ রফিক বাবন
নাটোর, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): মোঘল স্থাপত্য শৈলীর অপরূপ নিদর্শন বৃ-চাপিলা শাহী জামে বড় মসজিদ। ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে পরিচিত তিন গম্বুজ এবং তিন দরজার মসজিদটি প্রায় চারশো’ বছরের ঐতিহ্যের ধারক।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নের বৃ-চাপিলা গ্রামে অবস্থিত। জেলা শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে বৃ-চাপিলা গ্রামের এ মসজিদটি সংস্কার করে বর্ধিত অংশে সংস্কার করা হয়েছে। তবে ভিত্তি অংশে মসজিদের মূল কাঠামোটির নকশা ও কারুকাজ অক্ষত রাখা হয়েছে। ফলে আধুনিকের সঙ্গে রচিত হয়েছে প্রাচীনের মেলবন্ধন।
জানা যায়, চাপিলা এক সময় ছিল মোঘল শাসনের প্রশাসনিক কেন্দ্র। মোঘল শাসনামলে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সুজা বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন। সে সময় চাপিলা গ্রামে মোঘল সেনাদের ফাঁড়ি ছিল। মানুষেরও বসবাস ছিল চাপিলায়। এ অঞ্চলের প্রাচীন দুর্গ, কাছারি বাড়ি, অট্টালিকা, জলাশয়, মসজিদ আর ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জুনের আদেশ অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে এখানে ফৌজদারি আদালত স্থাপনের খবর পাওয়া যায়। ইংরেজ শাসনামলের পূর্বে মোঘল কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয়দের নামাজের জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেন তৎকালীন মোঘল কর্মকর্তা মুনশি এনায়েতউল্লাহ। মসজিদের গায়ে খোদাই করে প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে তাঁর নামও লেখা ছিল।
গুরুদাসপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়নে উল্লেখ করা হয়েছে, বাদশা শাহজাহানের সময়কালে ১৬২৮-১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়। এক সময় মোঘল সেনাসহ এলাকার বাসিন্দারা অন্যত্র চলে যান। কালক্রমে ধ্বংস হয় চাপিলা নগরী। এরপর বহুদিন লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায় এই অঞ্চল। মসজিদটিও হয়ে পড়ে জঙ্গলাকীর্ণ।
১৯৪৭ এর দেশভাগের পর এ এলাকায় বসতি গড়তে থাকেন মুর্শিদাবাদ, কলকাতা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত মানুষেরা। ঐ সময় জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে এলাকাবাসী মসজিদটির সন্ধান পান। দীর্ঘ সময় জঙ্গলে আবৃত থাকা মসজিদটি তাঁরা সংস্কার করে পুনরায় নামাজ শুরু করেন। জঙ্গল পরিষ্কার করে আকস্মিক মসজিদ দেখতে পাওয়ায় কেউ কেউ প্রচার করেন, গায়েবিভাবে মসজিদটি এক রাতের মধ্যে সৃষ্টি!
ইট-সুরকি দিয়ে তৈরি মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট ও প্রস্থ ২০ ফুট। এটির দেয়ালের পুরুত্ব চার ফুটের কাছাকাছি। মসজিদটিতে রয়েছে বিশাল আকৃতির তিনটি গম্বুজ ও দুই পাশে দুটি মিনার। প্রতিটি গম্বুজ ও মিনারের শীর্ষে অবস্থান করছে চাঁদ-তারা। গম্বুজগুলো সোনালি রঙের হওয়ায় দূর থেকে দেখলে মনে হয় সোনা দিয়ে মোড়ানো। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে অপরূপ নকশাঁ আর কারুকাজে সুসজ্জিত তিনটি দরজা। মসজিদের ভেতর প্রতিটি দেয়াল ও মেহরাবে অপরূপ টেরাকোটার নকশা এবং বিভিন্ন কারুকাজে ভরপুর। এখনও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন মসজিদটি দেখতে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এখানে নামাজ আদায় করেন।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির কোষাধাক্ষ ফারুক হোসেন বলেন, এই এলাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের বসবাস ছিলো। ১৯৪৭ এর পরে আমার নানা মিয়া হোসেন সরকার ময়মনসিংহ থেকে বৃ-চাপিলা গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। নানার মুখে শুনেছি, সে সময় বিশাল আকৃতির বেত গাছের ঝোপঝাড়ের নীচে ঢাকা পড়েছিল মসজিদটি। জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে মসজিদটির সন্ধান পাওয়া যায়। পরে আমার নানাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে মসজিদে আবার নামাজ আদায় শুরু করেন।
চাপিলা সাধুপাড়ার বয়োবৃদ্ধ এমদাদুল হক বলেন, মোঘল আমলে জনশূন্য হয়ে পড়া এই এলাকা জুড়ে ছিল বেতের জঙ্গল। পুরো এলাকা জুড়ে বাঘ ও সাপসহ বন্য প্রাণীদের বসবাস ছিল। ১৯৬০ সালের পর থেকে এই এলাকায় আবারও মানুষের বসবাস শুরু হয়। ৬০ এর দশকে মসজিদটির পরিষ্কার করার পর বাঘের ভয়ে মুসল্লিরা পর্যায়ক্রমে পাহারা দিয়ে নামাজ পড়তেন।
মসজিদটির খতিব মওলানা মাহমুদুল্লাহ বলেন, মসজিদে তিন কাতারে ৬০-৬৫ জন মুসল্লী নামাজ পড়তে পারতেন। ১৯৯০ সালের পর মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়। মোঘল আমলের মসজিদটিতে অনেক কারুকাজ থাকলেও সময়ের বিবর্তনে কিছু কারুকাজ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি ওয়াক্তে নিয়মিত ৫০-৬০ জন নামাজ পড়েন মসজিদটিতে। জুম্মার দিনে দুই থেকে আড়াইশ’ মুসল্লির সমাবেশ ঘটে। তবে মুসল্লী বেশি হওয়ায় বারান্দাসহ পাশের ঈদগাহ মাঠে চট বিছিয়েও নামাজ পড়তে হয়। এ জন্য মসজিদটির আরো সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
চাপিলা ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল হান্নান বলেন, শাহী মসজিদের নামে ৬৫ বিঘা জমি মুন্সী এনায়েত উল্লাহ নামে একজন দান করেছেন বলে ১৯২০ সালের রেকর্ডে উল্লেখ আছে। তবে মুন্সী এনায়েত উল্লাহ মুঘল আমলের সরকারি কর্মচারী ছিলেন এটা জানলেও বিস্তারিত পরিচয় বা তার বংশধর কারা এই বিষয়ে কোনও তথ্য স্থানীয়রা জানেন না।
মৌখাড়া ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান বলেন, এটি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এটি। সময়ের প্রয়োজনে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদ কলেবর বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে মূল মসজিদের আকার-আকৃতি যেন ঠিক রাখা হয় এটিই আমাদের দাবি।
নাটোর-৪ আসনে নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজ বলেন, মোঘল স্থাপত্য শৈলীর অপরূপ নিদর্শন বৃ-চাপিলা শাহী জামে বড় মসজিদ আমাদের ঐতিহ্যের ধারক। মসজিদটির টেরাকোটা কারুকাজ সংস্কারসহ মসজিদটি পর্যটন-বান্ধব করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।