বাসস
  ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫:৪৬
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৪৫

রংপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রেজাউল হকের ইন্তেকাল

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রেজাউল হক। ফাইল ছবি

রংপুর, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): রংপুর কারমাইকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবং রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রেজাউল হক আর নেই।

তিনি আজ শনিবার সকাল ন'টার দিকে  রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।)

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিসসহ নানারকম বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।

অধ্যাপক ড. রেজাউল হকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক আবিদ করিম মুন্না স্থানীয় সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মৃত্যুকালে অধ্যাপক ড. রেজাউল হক স্ত্রী, এক পুত্র, দুই কন্যাসহ অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানসহ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অংগনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।

তার মৃত্যুতে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীসহ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অমূল্য দিশারীকে হারাল।

তার সৃষ্টিশীলতা, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব রংপুরের মানুষ দীর্ঘকাল স্মরণে রাখবে।

তিনি ১৯৩৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মিঞা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

তার শৈশব ও কৈশোরের অনেকটা সময় চিলমারীতেই কেটেছে।

তিনি ১৯৫০ সালে চিলমারী ইংলিশ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫২ সালে কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন।

পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।

১৯৭৭ সালে তিনি সরকারিভাবে পিএইচডির জন্য মনোনীত হন এবং ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার গবেষণার কাজ সম্পন্ন করেন।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রেজাউল হকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৮ সালে সিলেটের মদনমোহন কলেজে যোগদানের মধ্য দিয়ে।

১৯৬১ সালের ৮ আগস্ট ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে যোগদানের মাধ্যমে তার সরকারি চাকুরিজীবন শুরু হয়।

১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা করেন।

পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ১৯৮১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন।

এরপর তিনি গাইবান্ধা সরকারি কলেজ ও দিনাজপুর সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯০ সালে তিনি পুনরায় তার প্রিয় প্রাঙ্গণ কারমাইকেল কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে ফিরে আসেন এবং ১৯৯১ সালে সেখান থেকেই অবসরে যান।

কর্মজীবনে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার প্রস্তাব পেলেও শিক্ষকতা পেশার প্রতি ভালোবাসার টানে তা গ্রহণ করেননি।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। ১৯৮৯ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তার গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ ‘শোকাতুর সংগত’।

এছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার অসংখ্য প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘হঠাৎ’ শিরোনামে তিনি তার প্রথম কবিতাটি রচনা করেছিলেন।

বিগত ২০০৭-২০০৮ সালে রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

তার আহ্বানেই গঠিত হয়েছিল “রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদ”।

তার সুযোগ্য নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলনের ফলস্বরূপ ২০০৮ সালে ‘রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে রংপুর বিম্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করা হয়।

বাসসের সাথে আলাপকালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা এবং ব্র্যাকের চেয়ারপারসন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রেজাউল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

তিনি মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন, তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং তাকে জান্নাত দান করার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন।