বাসস
  ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:২৭

বাংলাদেশে মেছো বিড়াল সংরক্ষণ দিবস উদযাপন হবে আগামীকাল

ঢাকা, ৩১ জানুযারি, ২০২৬ (বাসস) : আগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে মেছো বিড়াল সংরক্ষণ দিবস উদযাপন করছে সরকার।

আন্তর্জাতিক মেছো বিড়াল সংরক্ষণ সংস্থা ২০১৬ সাল থেকে এই দিবসটি পালন করা হয় এবং ২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশে বিপন্নতা বিবেচনায় প্রাণিটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের উদ্যোগে দিবসটি পালন শুরু হয়।

বর্তমান সরকারের এক বছরের উদ্যোগের ফলে মানুষু মেছোবিড়াল দ্বন্দ্বে মেছোবিড়ালের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। 

গবেষণা অনুযায়ী ২০২৪ সালের তুলনায় সরকারি উদ্যোগগুলোর কারণে মেছো বিড়াল মৃত্যুহার এবং মানুষ-মেছো বিড়াল দ্বন্দ্ব অর্ধেকে হ্রাস পেয়েছে। যেখানে  স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহনশীলতা বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সংঘর্ষের বদলে উদ্ধার ও অবমুক্তকরণের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নজির তৈরি হওয়ায় বন্যপ্রাণী হত্যার ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে শুরু করেছে।

আজ শনিবার এক তথ্যবিবরণীতে এ কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতা, জনসচেতনতার অভাব এবং নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে  বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি।

এর মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত ও ভুলভাবে উপস্থাপিত ও আতংকিত মানুষের সহিংসতা ও নির্মমতার শিকার প্রাণীগুলোর একটি হলো মেছো বিড়াল। মানুষের অজ্ঞতা ও ভয়ের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি নির্ভর প্রাণীটি বছরের পর বছর ধরে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় উদ্যোগে মেছো বিড়াল সংরক্ষণে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো মেছো বিড়ালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণ অগ্রাধিকারভূক্ত প্রানী হিসেবে চিহ্নিত করে। আগে যেখানে এই প্রাণীটি জাতীয় নীতিনির্ধারণের আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেখানে বর্তমান সরকারের সময়ে মেছো বিড়াল সংরক্ষণকে জলাভূমি সংরক্ষণ, মানুষ-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখা হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনই ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করেছে।

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সুরক্ষা) অধ্যাদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী মেছো বিড়াল হত্যা বাংলাদেশে জামিন অযোগ্য অপরাধ। মেছো বিড়াল বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী, যা জলাভূমি ও কৃষিভিত্তিক প্রতিবেশে খাদ্যশৃঙ্খল ও কৃষি অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সুরক্ষা) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এ মেছো বিড়ালকে সংরক্ষিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রজাতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মেছো বিড়াল হত্যা, ধরা, বিষ প্রয়োগ, ফাঁদ পাতা কিংবা যে কোনোভাবে ক্ষতিসাধন গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য। এই অপরাধকে জামিন অযোগ্য হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।

মেছো বিড়াল সংরক্ষণে সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিশ্ব মেছো বিড়াল দিবস উদযাপন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এই দিবসটি জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে মেছো বিড়াল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।

গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংরক্ষণকর্মীদের অংশগ্রহণে এই দিবসটি মেছো বিড়ালকে ‘ক্ষতিকর প্রাণী’ থেকে ‘প্রকৃতি ও কৃষির বন্ধু’ হিসেবে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়।

বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় বাংলাদেশ বন বিভাগকে মেছো বিড়াল সংরক্ষণে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মানুষ-মেছো বিড়াল দ্বন্দ্ব মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার, পুনর্বাসন ও নিরাপদভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এর ফলে আগের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে মেছো বিড়াল হত্যা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় মানুষ-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্বের গুরুত্ব, মেছো বিড়ালের আইনগত সুরক্ষা এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এর ফলশ্রুতিতে প্রথমবারের মতো মেছো বিড়াল হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা সংরক্ষণ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ অঞ্চলে, যেখানে মানুষু-মেছো বিড়াল দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বেশি, সেখানে সরকারের উদ্যোগে ক্যারাভেন ভ্যান কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই ভ্রাম্যমাণ সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে মানুষকে মেছো বিড়ালের প্রকৃত ভূমিকা, আইনগত সুরক্ষা এবং দ্বন্দ্ব এড়ানোর উপায় সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বার্তা পৌঁছে দেওয়ায় এই উদ্যোগটি বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের সচেতনতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং পাঠ্যসূচিতে মেছো বিড়ালসহ বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণী সম্পর্কে তথ্য অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

গত ২০২৫ সালের পহেলা বৈশাখে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ছিল মেছো বিড়ালের আকৃতি ও সংরক্ষণ বার্তাসংবলিত বিশেষ শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি ও দেশব্যাপী বিতরণ। এটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে সাংস্কৃতিক উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি অভিনব প্রয়াস, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

বাংলাদেশে মেছো বিড়াল সংরক্ষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রমাণ করে সঠিক সদিচ্ছা, কর্মপরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা, জনগণকে সম্পৃক্তকরণ, নীতিগত অগ্রাধিকার ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্ভব। মেছো বিড়াল সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রজাতি রক্ষা নয়; এটি জলাভূমি সংরক্ষণ, কৃষি অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের টেকসই ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি সমন্বিত প্রয়াস।