
ঢাকা, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্প থেকে আত্মসাৎ করা অর্থে কেনা জমি, জমির শেয়ার, ফ্ল্যাট ও ব্যাংকে স্থিত অর্থ জব্দ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
শাহজালাল ফার্টিলাইজারের সাবেক হিসাব বিভাগের প্রধান খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল ও রসিদ জমা দিয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজ নামীয় ও স্ত্রী হালিমা আক্তারের নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেনার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় উক্ত সম্পদসমূহ জব্দ করেছে সিআইডি।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, জব্দকৃত সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা। শাহজালাল ফার্টিলাইজারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অনুসন্ধান শেষে সিআইডি বাদি হয়ে ২০২৩ সালের ২৬ এপ্রিল মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে।
এতে আরও বলা হয়, জব্দকৃত সম্পত্তির মধ্যে ২৩ দশমিক ৫ কাঠা জমি, ১১টি শেয়ার যার মোট জমির পরিমাণ ৩৯২ দশমিক ৭৩২৩ অযুতাংশ, ১২টি ফ্ল্যাট যার দলিল মূল্য ৮ কোটি ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯০ টাকা হলেও বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশক্রমে তিনটি ব্যাংক এ্যাকাউন্টে মোট ৩০ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫২ টাকা জব্দ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তে যায়, ২০০৫ সালে বিসিআইসির প্রকল্প শাহজালাল সার কারখানায় সহকারী হিসাব রক্ষক পদে চাকরি নেন খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে হিসাব বিভাগের প্রধান হন। ১৪ বছরের চাকরি জীবনে ৯১টি গাড়ি, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, দু’টি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও ঢাকা-গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অর্থ আত্মসাতের কারণে ৫ বছর আগে ওই কারখানা থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
মামলাটির তদন্তে আরও জানা যায়, ২০২২ সালের জুনে ইকবাল ও তার স্ত্রী হালিমা আক্তারকে গ্রেফতার করে অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। পরে র্যাবের অভিযোগের ভিত্তিতে ইকবাল ও হালিমা দম্পতির বিষয়ে মানিলন্ডারিং অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি।
মামলার এজাহারে উল্লেখ কর হয় যে, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল ও রসিদ জমা দিয়ে বিসিআইসির শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৫১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এসব ভুয়া বিল ও রসিদ তৈরি করা হয়েছে ইকবালের স্ত্রী হালিমা আক্তারের দু’টি প্রতিষ্ঠান টিআই ইন্টারন্যাশনাল ও নুসরাত ট্রেডার্সের নামে। স্ত্রীর নামে দু’টি নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে ভুয়া বিল ও রসিদ জমা দিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বিসিআইসির সার কারখানার একটি প্রকল্প শাহজালাল ফার্টিলাইজার থেকে ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৫১ টাকা তুলে নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও এই জালিয়াতির ঘটনায় পৃথকভাবে ২৬টি মামলার তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মামলাটি তদন্তকালীন আরও কিছু স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়। জব্দ হওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে ঢাকার রমনা ও এয়ারপোর্ট এলাকায় ৬টি ফ্ল্যাট; ঢাকা, গাজীপুর ও ময়মনসিংহে মোট ৩০৪ শতাংশ জমি রয়েছে (যার দলিল মূল্য ৭ কোটি ১১ লাখের অধিক)। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবালও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৯১টি গাড়ির নিবন্ধন রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২১টি মিনিবাস ও ২টি হাইচ জব্দ করা রয়েছে। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে ২১টি মিনিবাসের রিসিভার হিসেবে অতিরিক্ত আইজিপি, সিআইডি, ঢাকা নিযুক্ত হওয়ায় উক্ত গাড়িগুলো বর্তমানে রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভাড়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ভাড়ায় চালিত উক্ত গাড়িগুলো হতে অদ্যাবধি ৫৩ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ টাকা লাভ হওয়ায় সম্পূর্ণ লভ্যাংশ বিজ্ঞ আদালতের অনুমতিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান করা হয়েছে।
বর্তমানে ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তথ্য উদঘাটন, অজ্ঞাত অপর সদস্যদের শনাক্তকরণ ও অন্যান্য আইনানুগ প্রক্রিয়ার স্বার্থে সিআইডির তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।