বাসস
  ১৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৬

সুনামগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাবারুণী শুরু

ছবি: বাসস

মুহাম্মদ আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ, ১৭ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : জেলার তাহিরপুরে অবস্থিত রূপের নদী যাদুকাটা। যেখান থেকে বালু-পাথর আহরণ করা হয়। যাদুকাটার পাশেই রয়েছে সীমান্তবর্তী পাহাড়। পাহাড় ও নদীর সৌন্দর্য হেমন্ত ও বর্ষায় অপরূপ রূপ নেয়।

তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীতেই আজ শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পণাতীর্থ ধামের মহাবারুণী ও গঙ্গাস্নান। এ উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী বারুণী মেলাও বসবে নদীতীরের বালুচরে। তবে উৎসবকে ঘিরে সড়কপথে লাখো পুণ্যার্থীর যাতায়াত দেখা গেছে।  

আয়োজক সূত্র বাসস’কে জানায়, এ বছর মহাবারুণী ও গঙ্গা স্নানের মুখ্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে, মঙ্গলবার ভোর ৫টা ৩০মিনিট ৫৯ সেকেন্ড থেকে সকাল ৮টা ৭মিনিট ৫৫ সেকেন্ড পর্যন্ত শতভিষা নক্ষত্রে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় উৎসবে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থী তাহিরপুরে সমবেত হন।

জানা যায়, কয়েক শতাব্দী ধরে একই সময়ে তাহিরপুর এলাকায় দুই ধর্মের মানুষের বড় ধর্মীয় সমাগম অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পণাতীর্থ ধামের স্নানযাত্রার পাশাপাশি মুসলমানদের জন্য হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর বার্ষিক ওরস ও মেলা। এই অঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ দুই ধর্মের সম্মিলন । তবে এ বছর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.)-এর ওরস ও মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পবিত্র শবে কদর ও ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে আসায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এ সময়ে কেবল পণাতীর্থ ধামের মহাবারুণী স্নান ও বারুণী মেলাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জানান, চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে যাদুকাটা নদীতে স্নান করলে সব পাপ মোচন হয় বলে প্রচলিত আছে। পুণ্য লাভের আশায় প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই সময়ে লাখো মানুষ আসেন যাদুকাটা বা পণাতীর্থে স্নান সারতে। এ নদীতে স্নান করাকে অনেকে গঙ্গা স্নানের সমতুল্য মনে করেন।

প্রচলিত আছে, ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে মাকে গঙ্গা স্নান করানোর জন্য যোগ সাধনা বলে পৃথিবীর সমস্ত তীর্থের জল যাদুকাটা নদীর প্রবহমান জলের ধারায় একত্রিত করে মাতৃআজ্ঞা পূরণ করেছিলেন তখনকার লাউড় রাজ্যের সাধক ও সিদ্ধপুরুষ অদ্বৈতচার্য। তার সাধনাসিদ্ধ ফল বারুনী যোগ নামে অভিহিত। চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীসহ সাত পুণ্যনদীর প্রবাহ একসঙ্গে যাদুকাটায় (পণাতীর্থে) এসে মিশে বলেও বিশ্বাস করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এজন্য তারা মনে করেন সব তীর্থের সেরা তীর্থ এটি। এখানে স্নান করলে গঙ্গা স্নানের চেয়েও বেশি পুণ্য হয় বলে বিশ্বাস রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে।

স্নানযাত্রা উপলক্ষে পণতীর্থগামী সড়কের বিভিন্ন অংশের বেহাল দশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অদ্বৈত আখড়াবাড়ি মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিক্ষক কানন বন্ধু রায় বলেন, পণাতীর্থগামী সড়কের বেশ কয়েকটি অংশে হেঁটে চলাও কষ্টকর। এলজিইডি’র পক্ষ থেকে সড়কটি উৎসবের আগেই যান চলাচলের উপযোগী করার কথা বলা হলেও রোববার বিকেল পর্যন্ত বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার থেকে পুরানগাঁও পর্যন্ত সড়কের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। এতে পুণ্যার্থীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসন বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি জেলা সদরের ফতেহপুর থেকে যাতায়াতের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী, সিএনজিতে জনপ্রতি ১৭০ টাকা, লেগুনায় ১৫০ টাকা, মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা এবং ফতেহপুর থেকে বিন্নাকুলি পর্যন্ত নৌকায় জনপ্রতি ১০০ টাকা নেওয়া হবে।

উৎসবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বাসস’কে বলেছেন, স্নান ও বারুণী মেলাকে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে । পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন, একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং র‌্যাবের টহলের ব্যবস্থাও থাকবে।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, মেডিকেল টিমসহ পুণ্যার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজারগাঁও অদ্বৈত আখড়াবাড়ি মন্দির, যাদুকাটা নদীর উভয় তীর, বালুচরের মেলাস্থল এবং ইসকন মন্দির এলাকায় চার স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, এই উৎসবকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।