বাসস
  ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৫০

বৈঠার ছন্দে মুখর নিকলী হাওর, নৌকাবাইচ দেখতে মানুষের ঢল

ছবি : বাসস

কিশোরগঞ্জ, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, মাঝিদের হুঙ্কার আর ঢোলের তালে তালে মুখর পুরো হাওর। 

দূর থেকে ছুটে আসছে একের পর এক নৌকা। কে আগে যাবে, সেই প্রতিযোগিতায় মাঝিদের প্রাণপণ চেষ্টা। আর হাওরের দুই পাড়ে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস। এমনই উৎসবমুখর পরিবেশে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে অনুষ্ঠিত হলো গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ।

আজ বুধবার বিকেলে নিকলী সদরের চইল্লাতি হাওরে নিকলী নাগরিক সমাজের আয়োজনে বসে নৌকাবাইচের এ জমজমাট আসর।

দুপুর গড়াতেই হাওরের পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, কেউবা দলবেঁধে। হাওরের চারপাশ যেন পরিণত হয় মিলনমেলায়। নৌকাবাইচ দেখতে নিকলী ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন হাজারো দর্শক।

নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল।

প্রতিযোগিতায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১০টি নৌকা অংশ নেয়। তিন পর্বে চলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। পানির বুক চিরে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে নৌকা। মাঝিদের বৈঠার টানে মুহূর্তেই বদলে যায় প্রতিযোগিতার দৃশ্যপট।

বড় নৌকার প্রতিযোগিতায় প্রথমস্থান অর্জন করেন নিকলী সদর ইউনিয়নের ইসরাফিল মাঝি। বিজয়ী হিসেবে তিনি পান একটি ফ্রিজ। দ্বিতীয় হন সিংপুরের ইটকলা সর্দার গ্রুপের মজিবুল্লাহ। পুরস্কার হিসেবে তিনি পান ৩২ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন।

ছোট নৌকার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয় পাচলীপাড়া দল। তারা পায় ২৪ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে নিকলীর গোবিন্দপুরের মোবারক দল। তাদের দেওয়া হয় একটি মোবাইল ফোন।

তবে পুরস্কারের চেয়েও যেন বড় ছিল অংশগ্রহণ আর আনন্দ। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি নৌকাকেই দেওয়া হয় বিভিন্ন সান্ত্বনা পুরস্কার।

আয়োজকদের ভাষ্য, নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির অংশ। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে মিশে থাকা এ আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে সেই পুরোনো দিনের সংস্কৃতিকে তুলে ধরারও একটি মাধ্যম।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মো. সাদ্দাম হোসেন সাদু। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নিকলী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক মো. শরিফুল হক।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু, সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. কফিল উদ্দিন আহমেদ, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল-২-এর পিপি অ্যাডভোকেট এ এম সাজ্জাদুল হক, উপজেলা বিএনপির ১নং সহসভাপতি আবু সাঈদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ছান্দালী মেম্বার, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব সাইফুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও হাওরের পাড় ছাড়েননি দর্শকরা। নৌকার গতি আর মাঝিদের বৈঠার ছন্দে মুহুর্মুহু করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।

একসময় যে নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ জীবনের নিয়মিত উৎসব, আধুনিকতার ভিড়ে তা অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। 

নিকলীর চইল্লাতি হাওরে এমন আয়োজন যেন আবারও মনে করিয়ে দিল সেই চিরচেনা গ্রামবাংলাকে। হাওরের ঢেউয়ে বৈঠার ছন্দে ফিরে এলো বাংলার সেই পুরোনো দিনের নৌকাবাইচ।