শিরোনাম

মো. মামুন ইসলাম
রংপুর, ২৭ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, রংপুরে একই পরিবারের চারজন খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই অভিযুক্তের ডিএনএ ও ডোপ পরীক্ষা দেশের আইন অনুযায়ী করা হবে।
নৃশংসভাবে খুন হওয়া রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থির মৃতদেহের ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
আরপিএমপি কমিশনার আজ নগরীতে তার কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।
কয়েকদিন আগে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থি (২৫) এবং ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়মকে (১২) শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
শনিবার রাতে পুলিশ জনপ্রিয় এই শিক্ষকের পরিবারের চারজনের পচনশীল মৃতদেহ তাদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে।
নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী রোববার এই চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ উপ-কমিশনার (ডিসি) সনাতন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি বিশেষ দল পৃথক অভিযান চালিয়ে শহর থেকে দুই হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মাছুয়াপাড়া এলাকার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয় দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।
তারা চারজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের সামনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
আজকের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, ময়নাতদন্তে প্রকাশিত তথ্য এবং আদালতে অভিযুক্তদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ময়নাতদন্তে জানা গেছে, প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তীসহ পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর কারণ ছিল শ্বাসরোধ।
এ সময় তিনি গ্রেপ্তারকৃত দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এবং অন্যান্য সাক্ষীদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি উপস্থাপন করেন।
গ্রেপ্তারকৃত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার একই বর্ণনা দিয়েছে।
তারা বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ১২টার পর ঐ শিক্ষকের বাড়ির ছাদে পৌঁছে একটি পানির ট্যাংকের পেছনে বসে ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করা শুরু করেন।
ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের সময় তারা খেয়াল করেনি কখন ভোর হয়ে গেছে।
এরপর ওই ছাদে বাড়ির মালিক গণপতি চক্রবর্তী গেলে তাকেসহ তারা সেখানেই তিনজনকে ও নীচের শয়নঘরে ছোট শিশুটিকে খুন করে।
সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, তারা সেদিন মোট আটটি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেছিল।
এর আগে, তারা একদিনে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেছিল।
তবে, মুগ্ধর জবানবন্দিতে সেদিন নয়টি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আটটি এবং পরে আরও একটি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনের বিবরণ হতে পারে।
সকালে গণপতি চক্রবর্তী তাদের ছাদে হাঁটতে দেখে বকাঝকা করেন এবং বলেন, ‘এত সকালে এখানে কী করছ তোমরা?’
তখন তারা ভয় পেয়ে যান। তাদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। তারা ভয় পাচ্ছিলেন, গণপতি চক্রবর্তী চিৎকার করে উঠবেন। তাদের ভাষ্যমতে, এরপর তারা তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন।
সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর গলায় তোয়ালে পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টানতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি মারা যান।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে জানা যায়, শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের তথ্য তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়।
গণপতি চক্রবর্তীর দেহ ঢেউটিন দিয়ে ঢাকার সময় তার স্ত্রী ও মেয়ে সম্ভবত একটি শব্দ শুনে ছাদে চলে আসেন।
তারা চিৎকার করতে শুরু করেন।
এরপর মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রীর গলা এবং সিদ্ধার্থ তার মেয়ের গলা চেপে ধরেন।
এক পর্যায়ে গামছা দিয়ে মেয়েটির গলা চেপে ধরা হয়। পরে কাছের একটি বাক্স থেকে দড়ি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টানা হয়। এভাবে মা ও মেয়েকেও হত্যা করা হয়।
এরপর, বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কিনা সেই ভয়ে তারা নিচতলায় চলে যান। সেখানে তারা একটি পুরোনো প্লায়ার্স খুঁজে পান এবং তা দিয়ে বৈদ্যুতিক তারটি কেটে দেন, যাতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পরে, তারা আবার ছাদে যান। তারা মা ও মেয়ের মৃতদেহ সিঁড়ির দিকে থাকা ছাদের গেটের ভেতরে রেখে দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পাশের বাড়ির ছাদ থেকে মৃতদেহগুলো যাতে দেখা না যায়।
তারপর তারা গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ঢুকে দেখে, তার ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তী প্রিয়ম জেগে উঠেছে।
শিশুটা সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে বলল, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘আমরা আগে খবর পেয়েছিলাম , শিশুটি ঘুমিয়ে ছিল, তার ভিত্তিতেই বিষয়টি রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তারা বলেছে যে, শিশুটি জেগে ওঠে, সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং তার নাম ধরে ডাকে। শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের খবর দিতে পারে, এই ভয়েই তারা তাকে হত্যা করেন।’
জবানবন্দি অনুযায়ী, গলায় দড়ি দিয়ে কাপড় পেঁচিয়ে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
এরপর তারা দুজনেই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তারা স্নান করেন এবং সঙ্গে থাকা আরেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করেন।
এরপর মুগ্ধ বাড়িটিকে চুরি বা ডাকাতির মতো দেখানোর একটি পরিকল্পনা করেন। তারা বাড়ির ড্রয়ারগুলো খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন গয়না নিয়ে নেন। সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন।
তারা বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকাও নিয়ে যান।
পরদিন শুক্রবার নামাজের সময় বাইরে লোকজনের আনাগোনা কমে গেলে, তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদ থেকে পাশের বাড়ির ছাদে চলে যান। তারপর তারা প্রাচীর টপকে বাইরে চলে যান।
মুগ্ধ দাসের আদালতের জবানবন্দিতেও ঘটনাটির প্রায় একই রকম বর্ণনা পাওয়া গেছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, এই ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা জরুরি।
কেউ কোনো ঘটনা শুনে বা দেখে থাকলে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাতে তিনি অনুরোধ করেন।