শিরোনাম

ঢাকা, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশের অর্থায়ন কাঠামোকে নতুনভাবে সাজাতে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান ও গোল্ডম্যান স্যাকসসহ বেশ কয়েকটি বড় বিদেশি ফান্ড ম্যানেজার বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
আজ (রোববার) রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বিল্ডিং ইনভেস্টরস কনফিডেন্স: ফ্রম পলিসি রিফর্ম টু ইফেকটিভ ইমপ্লিমেন্টেশন’ শীর্ষক মধ্যাহ্নভোজসভায় দীর্ঘ বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য প্রায় পুরোপুরি প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা মোটেও সঠিক নয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হলেও তারা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণ করছে। অথচ বড় বিনিয়োগের অর্থায়ন হওয়া উচিত পুঁজিবাজারের মাধ্যমে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী আর্থিক কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো ব্যাংকঋণনির্ভর ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছে। এ কারণে সরকার বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজছে এবং ভবিষ্যতের জন্য অর্থায়নের কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর কাজ করছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বাইরেও নতুন অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে বিকল্প অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমীর খসরু বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ বহু আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের আর্থিক পণ্য ব্যবহার করছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। এখন সেই পরিবর্তন শুরু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বন্ডের সুদের হার ব্যাংকঋণের সুদের হারের তুলনায় কম। এ ছাড়া ইকুইটিভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগও রয়েছে। ফলে অর্থায়নের ব্যয় কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে পরিবর্তন এবং পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিধিবিধানে সংস্কারের ফলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বিদেশি ফান্ড ম্যানেজারদের কাছ থেকে সরকার ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে। শুধু এক বা দুজন নন, বেশ কয়েকজন বড় ফান্ড ম্যানেজার বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে জেপি মরগান ও গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ ব্যাংকও বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে অর্থমন্ত্রী মনে করেন, দেশের বাজার মূলধন এখনো অনেক ছোট। তাই আরও বেশি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে।
ব্যাংক খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে অনেক ব্যাংক বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। এসব ব্যাংকে মারাত্মক মূলধন ঘাটতি রয়েছে। অর্থপাচার এবং উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
তিনি বলেন, অনেক আমানতকারী তাঁদের অর্থ তুলতে পারছেন না। আবার অনেক ব্যবসায়ী কার্যকর মূলধন, ঋণপত্র খোলা এবং অন্যান্য অর্থায়নসংক্রান্ত সমস্যায় পড়ছেন। ফলে ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারি সহায়তা, উদ্ধার তহবিল এবং অন্যান্য পুনঃমূলধনীকরণ কার্যক্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
কর ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, ব্যবসায়ীদের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো করব্যবস্থার জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক হয়রানি ও দুর্নীতি। এসব সমস্যা দূর করে কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত শুধু বিশ্বের তুলনায় নয়, আঞ্চলিক মানদণ্ডেও অনেক কম। এ কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি অংশে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটি অংশ নীতিনির্ধারণ করবে, অন্যটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে একই ব্যক্তিরা করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করতেন। নতুন ব্যবস্থায় করনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের হাতে দেওয়া হবে, যাতে নীতিনির্ধারণের সময় ব্যবসা, করদাতা, রাজস্ব আহরণ এবং ভোগব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া যায়।
তিনি আরও জানান, পুরো করব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও এ ক্ষেত্রে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে, তারপরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়তা বাস্তবায়ন করা হবে। এটি কার্যকর হলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে কর ফেরত পাওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম অনলাইনে এবং দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডিরেগুলেশন নীতির কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে অতিনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পুরো প্রক্রিয়া তদারকির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, খুব শিগগিরই একটি ওয়েবসাইট চালু করা হবে, যেখানে ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকেরা নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে যেকোনো ধরনের বাধার বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারবেন। সরকার প্রতিদিন এসব অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করবে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সরকারের নতুন নীতির কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে যেসব উদ্যোক্তা রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের সবাইকে শুল্কমুক্ত বন্ডেড লাইসেন্স দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নতুন কোনো রপ্তানিপণ্য নিয়ে কেউ এগিয়ে এলে তিনি বন্ডেড গুদাম সুবিধা, করমুক্ত সুবিধা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের সুবিধা পাবেন। আর যারা বন্ডেড গুদাম ব্যবহার করতে চান না, তারা ব্যাংক গ্যারান্টির আওতায় একই ধরনের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের সমস্যার কথাও এ সময় তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অর্থনীতির অগ্রগতি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে এসব সমস্যার পুরোপুরি সমাধান খুব দ্রুত সম্ভব নয়।
তিনি জানান, গ্যাস খাতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, স্থলভিত্তিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়ে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালনব্যবস্থা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমীর খসরু বলেন, সরকার একটি সমন্বিত জ্বালানি কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস এবং কয়লাভিত্তিক জ্বালানির মধ্যে সমন্বয় থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে শক্তিশালী ইন্টারনেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমন দাবি সরকার করছে না। তবে ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে সরকার সবসময় আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং যেকোনো যৌক্তিক সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান প্রমুখ ।