বাসস
  ২৬ জুলাই ২০২৬, ২০:০৫

চীনা বিনিয়োগে উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন চায় বাংলাদেশ : ড. তিতুমীর

রোববার রাজধানীতে এনএসইউ ও এসআইপিজি আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ছবি : বাসস

ঢাকা, ২৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করতে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ শুধু বিনিয়োগ নয়, উৎপাদন বাড়ায়Ñএমন বিনিয়োগ চায়।

রোববার রাজধানীতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: বর্ধিত আস্থা ও নতুন দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা শিল্পায়ন। চীনের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চায়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রথমে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, এরপর পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পরে পুনর্গঠনের পথে এগোতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রপ্তানি সম্প্রসারণ।

বাংলাদেশ ও চীনের বাণিজ্য সম্পর্কের অসমতার বিষয়টি তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, দু’দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছালেও চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের কম। এই ব্যবধান কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

চীনের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের মতো মূল্য সংযোজন পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশি পেয়ারা ও কাঁঠালের জন্য চীনের বাজার উন্মুক্ত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। ভবিষ্যতে আরও সম্ভাবনাময় পণ্যের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়বে বলে বাংলাদেশ আশা করে।

ড. তিতুমীর বলেন, চীনা বিনিয়োগ শুধু একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্যান্য বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিভিন্ন খাতে সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। শিল্প স্থানান্তর ও বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুন সুযোগ তৈরি করতে চায়।

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ চট্টগ্রামকে একটি আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এ ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, রেল যোগাযোগ উন্নয়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম দ্রুতগতির রেল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, আধুনিক মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তা বড় ভূমিকা রাখবে।

কুনমিং-চট্টগ্রাম মাল্টিমোডাল পরিবহন করিডোর এবং বাংলাদেশ–চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের (বিসিএম) বিষয়েও ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানান তিনি।

জ্বালানি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন ড. তিতুমীর। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি দক্ষতা এবং ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীশাসন, ড্রেজিং প্রযুক্তি ও পানি ব্যবস্থাপনায় উভয় দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানো যেতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে চীনের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করে ঢাকা।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, ওই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সর্বোচ্চ কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এখন এই সম্পর্কের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে উৎপাদনভিত্তিক বিনিয়োগের বিকল্প নেই। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের কেন্দ্রে থাকবে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

সেমিনারে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, গবেষক, চীনা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।