বাসস
  ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৯:০৫

হাওরে চায়না দুয়ারি জালের আগ্রাসন, হুমকিতে নেত্রকোণার জলজ জীববৈচিত্র্য

ছবি : সংগৃহীত

মো. তানভীর হায়াত খান

নেত্রকোণা, ১৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : জেলার মদন উপজেলার বিভিন্ন হাওর, নদী ও বিল-খালে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি জাল’-এর অবাধ ব্যবহারে মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে দেশীয় মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্য। অত্যন্ত ক্ষতিকর ও মিহি বুননের এই জালের ভয়াবহ আগ্রাসনে হাওরাঞ্চলের জলজ প্রাণীর অবাধ প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং ঐতিহ্যবাহী মিঠাপানির মাছের বংশবৃদ্ধি।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন কোয়ালিশন কমিটির সহসভাপতি পরিতোষ সরকার বলেন, ‘দুয়ারি জাল মাছের স্বাভাবিক প্রজনন চক্রকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে হাওরে মাছের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা স্থানীয় জেলেদের জীবিকা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলবে। এ ছাড়া এই জাল ব্যবহারের সময় পানির নিচের ঘাস ও ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ উপড়ে আসে, যা মাছের প্রধান আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস। ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে হাওরের পুরো খাদ্যশৃঙ্খল।’

হাওরের মৎস্য সম্পদ ও সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশবাদী সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণ প্রশাসনের কাছে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা মদন উপজেলার সমস্ত হাওর, নদী ও খালে চায়না দুয়ারি জাল ও রোটানল বিষের ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা; স্থানীয় বাজার ও জলাশয়গুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ জাল তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ ও ধ্বংস করা; মৎস্য অফিসের তদারকি ও নজরদারি বৃদ্ধি করা এবং এই জালের উৎপাদন, বিপণন, আমদানি, সংরক্ষণ ও বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করার আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এখনই যদি এই অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ মৎস্য ভাণ্ডার পুরোপুরি শূন্য হয়ে পড়বে।

পরিবেশবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান বাসসকে জানান, অতীতে এই অঞ্চলের হাওর ও জলাশয়গুলোতে প্রায় ২৭০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু কালক্রমে জলাভূমির বিলুপ্তি, অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, জলাশয় সেচে মাছ ধরা, ক্ষতিকর ‘রোটানল’ বিষের ব্যবহার, পোনা মাছ নিধন ও জলজ উদ্ভিদ ধ্বংসের কারণে ইতোমধ্যে শতাধিক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রায়। এর ওপর নতুন আতঙ্ক হিসেবে যোগ হয়েছে এই চায়না দুয়ারি জাল। 

তিনি বলেন, মদন উপজেলার তলার হাওর, গণেশের হাওর, বন্দের হাওর, মহিষের হাওর, জাহাঙ্গীরপুর হাওর ও কাতলার হাওরসহ স্থানীয় মগড়া নদী, সাইডুলি নদী এবং বিভিন্ন বিল-খালে আইন অমান্য করে অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ক্ষতিকর জাল। যার ফাঁদে আটকে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, মাছের পোনা, রেণু, চিংড়ি, কচ্ছপ, ব্যাঙ ও কাঁকড়াসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলা প্রশাসন হাওরে দেশীয় মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে চায়না দুয়ারি জাল জব্দ কর পুড়িয়ে নষ্ট করা হচ্ছে। চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে জেল আর্থিক জরিমানা করা হচ্ছে এবং নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।