শিরোনাম

আল-আমিন শাহরিয়ার
ভোলা, ১১ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় টানা ১০ দিনের বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও চরাঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কর্মহীন হয়ে পড়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। দীর্ঘ দিন ধরে পানি আটকে থাকায় বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে উপকূলজুড়ে ভারী বর্ষণ ও অতি জোয়ার অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠেছে বলে খবর মিলেছে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঘর থেকে বের হতে না পারায় দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও দৈনন্দিন কাজকর্ম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে কাজ করতে না পারায় দিনমজুর, জেলে, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। আয় বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারের চুলায় হাঁড়ি উঠছে না। খাদ্য সংকটে পড়া পরিবারগুলো দ্রুত শুকনো খাবার, চাল-ডাল ও বিশুদ্ধ পানির সহায়তা চেয়েছেন।
সরেজমিনে সকাল সাড়ে ১০টায় সাকুচিয়া ইউনিয়নের খারির খাল এলাকা, মাস্টারহাট, লতাখালী এলাকায় দেখা গেছে, কয়েক দিন ধরে অব্যাহত বৃষ্টি আর জোয়ারের তীব্রতায় পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক পরিবারের ঘরের ভেতর ও উঠানে পানি জমে গেছে। কেউ কেউ ঘরের ভেতর উঁচু মাটির চুলা তৈরি করে রান্না করছেন, আবার অনেকে প্রতিবেশীর বাড়ি বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

মনপুরা উপজেলার কলাতলি ইউনিয়ন বিভিন্ন গ্রাম, সাকুচিয়া ইউনিয়নের খারির খাল এলাকা, মাস্টারহাট, লতাখালী ও বাতানখালী এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া বিচ্ছিন্ন কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর, কাজীরচর ও কলাতলী চরের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল তিন থেকে চার ফুট পানিতে ডুবে গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুর গ্রাম ও দক্ষিণ সাকুচিয়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট ও চরযতিনের নিম্নাঞ্চল, সোনারচর গ্রামের পূর্ব ও পশ্চিম অংশেও পানি জমে রয়েছে। জেলার মূল ভূখণ্ডের পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়েছে।
হাজিরহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা-রাকিবুল, শাহে আলম, আব্দুল্লাহ, দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের আবু তাহের, পরিমল, রাবেয়া খাতুন; উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুল, নুরনবী; এবং মনপুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা কালাম ফরাজী, রায়হান ও গৃহিনী খাদিজা বেগম বলেন-পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই চারপাশে বেড়িবাঁধের কাজ চলায় বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
উপজেলার বেশ কয়েকটি স্লুইসগেট অকেজো হয়ে আছে এবং বিভিন্ন খাল স্থানীয়ভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে বৃষ্টির পানি লোকালয়ে আটকে যাচ্ছে। দ্রুত স্লুইসগেট মেরামত, খাল পুনঃখনন ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
জলাবদ্ধতার কারণে অনেক নলকূপের আশপাশ ডুবে গেছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়ার পাশাপাশি ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলো।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বাসস’কে বলেন, সারাদেশের মতো মনপুরাতেও টানা বর্ষণের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারও হাত নেই। তবে পানি নিষ্কাশনের কাজ চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত জরুরি ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইসগেট সংস্কার, খাল দখলমুক্ত করা এবং পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তারা।
এদিকে দুর্যোগ কবলিত মনপুরা-চরফ্যাশনের মানুষের সার্বিক খোঁজ-খবর নিচ্ছেন-সেখানকার (ভোলা-৪ আসন) সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম নয়ন।
তিনি বাসস’কে বলেন-পানিবন্দী মনপুরা ও চরফ্যাশনের মানুষের তালিকা প্রনয়ণের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক সহায়তা ও পূনর্বাসনের জন্য আগামীকাল রোববার দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রীর কাছে ডি-ও লেটার জমা দেয়া হবে।
তিনি জানান, পানিবন্দী অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে ইতোমধ্যেই সেখানকার বিএনপি নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছি। চরাঞ্চল কিম্বা নিম্নাঞ্চলের একটি পরিবারও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হবেন না বলেও জানান সরকারের দায়িত্বশীল এ সংসদ সদস্য।
মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আবু মুছা বাসস’কে জানান, জলাবদ্ধতা নিষ্কাশন ও পানিবন্দি মানুষকে রক্ষায় আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের সমন্বয়ে কাজ করছি। অসহায় সম্বলহীনদের তালিকা প্রনয়ণের কাজ শেষে তাদের সহযোগিতা করারও চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
এছাড়াও জেলার চরফ্যাশনের ঢাল চর, কুকরী-মুকরী, চর পাতিলা, কচ্ছপিয়া, ভোলা সদরের ইলিশা, রামদাসপুর, মাঝের চর, বরাইপুর, দৌলতখানের মদনপুর, হাজীপুর চর নেয়ামতপুরে প্লাবিত এলাকাগুলোর পানির উচ্চতা এখন কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার অধিবাসী ও জনপ্রতিনিধিগণ। পানির এই প্রবাহ এখন নিম্মমুখী হওয়ায় সেখানকার চরাঞ্চলের মানুষরা এখন শঙ্কামুক্ত বলে খবর মিলেছে।
ভোলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বাসস’কে বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্রবন্দরগুলোতে তিন নম্বর সতর্কতা বহাল রয়েছে। এর প্রভাবে গত কয়েকদিন ভোলায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল এবং বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় সর্বমোট ৩৪ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান বাসস’কে জানিয়েছেন, টানা বর্ষণ ও জোয়ারের কারণে গত কয়েকদিন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হলেও বর্তমানে জোয়ার ও বৃষ্টির পানি কমতে শুরু করেছে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক দিনে পানি আরও কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক ডা.শামীম রহমান গণমাধ্যমকে বলেন-দুর্গত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য উপকরণ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কোনো মানুষ যেন সহযোগিতা ছাড়া না থাকেন সেজন্য তার প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছেন বলেও জানান তিনি।