বাসস
  ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৮:৩৫

সার্কের লক্ষ্যকে বাস্তবায়নযোগ্য রূপ দিতে হবে: শামা ওবায়েদ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আজ বিআইআইএসএস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

ঢাকা, ৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এখনো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির আওতায় দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় সার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

আজ রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘রিবিল্ডিং ট্রাস্ট, রিনিউইং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এটিই সেই জায়গা, যেখানে ইতিহাস ও ভবিষ্যতের মিলন ঘটেছে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সার্ককে শুধু একটি আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করে, যেখানে দেশের কূটনৈতিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার সমন্বয় ঘটেছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্ক বাংলাদেশের জন্য বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক উত্তরাধিকার, যার দূরদর্শী উদ্যোগ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় স্থান করে দেয়।

তিনি বলেন, ‘তবে এ উত্তরাধিকার শুধু অতীতের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।’

সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ব্যাখ্যা করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কেবল একটি স্লোগান নয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে এর অর্থ হলো এমন একটি প্রতিবেশ গড়ে তোলা, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জলবায়ু সহনশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।’

তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বিপুল মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিভক্তি ও দুর্বল অর্থনৈতিক সংযোগের কারণে এটি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে কম সমন্বিত অঞ্চলগুলোর একটি।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিরোধ এবং দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার কারণে গত কয়েক দশকে এ অঞ্চল বহু গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়েছে এবং সার্কও তার প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সার্ক গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। শীর্ষ সম্মেলন প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে আছে, রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি রয়েছে এবং আঞ্চলিক সংহতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।’

তবে তিনি বলেন, সার্ক এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, এর সনদ এখনো কার্যকর রয়েছে এবং এর সচিবালয়, বিশেষায়িত সংস্থা, আঞ্চলিক কেন্দ্র, আইনি কাঠামো, কারিগরি নেটওয়ার্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা এখনো সক্রিয় রয়েছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার যে কোনো অর্থবহ উদ্যোগ শুরু করতে হবে সংস্থাটির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর সৎ মূল্যায়নের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি সার্কের বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অধিক আর্থিক সংস্থান, আরও কার্যকর বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়ন ও অনুসরণ সংস্কৃতি জোরদার করাও প্রয়োজন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বাস্তবধর্মী ও ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশলের মাধ্যমে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার পক্ষে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবেশ শীর্ষ পর্যায়ের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটিকে ‘সর্বোত্তম কার্যকর পর্যায়ে’ পরিচালিত রাখার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, ‘সর্বোত্তম কার্যকর সার্ক’ বলতে নিয়মিত কর্মকর্তা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের বৈঠক, পূর্বনির্ধারিত কার্যক্রমের ক্যালেন্ডার, শক্তিশালী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, বিতর্কহীন খাতে অধিক সহযোগিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের জন্য দৃশ্যমান ও বাস্তব সুফল নিশ্চিত করাকে বোঝানো হয়েছে।

তিনি আগ্রহী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রকল্পভিত্তিক নমনীয় সহযোগিতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, যেসব দেশ নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত, তাদের সে সুযোগ দেওয়া উচিত এবং পরবর্তীতে অন্য দেশগুলোর যোগদানের পথও উন্মুক্ত রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত প্রায় চার মাসে তিনি সার্কের প্রতিটি সদস্য দেশের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে সবাই অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমার মনে হয়, আমাদের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। সদিচ্ছাকে বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপে পরিণত করতে হবে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডকে (এসডিএফ) আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাস্থ্য, কৃষি, জলবায়ু অভিযোজন, পল্লী উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তা এবং সামাজিক উন্নয়ন খাতে কার্যকর আঞ্চলিক প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এ তহবিলের সুশাসন, নেতৃত্ব ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সার্ককে অবশ্যই দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, সার্ক সনদে বিতর্কিত দ্বিপক্ষীয় বিষয় সংস্থার অভ্যন্তরে আলোচনার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং এ নীতিই ভবিষ্যতেও আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয় যে সার্কের মাধ্যমে কোনো দুটি দেশকে রাজনৈতিক সংলাপে বাধ্য করা হবে। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতিটি ক্ষেত্রকে অচল করে দিতে না পারে।’

আঞ্চলিক কাঠামোর বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ সার্ক ও বিমসটেককে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা হিসেবে দেখে না।

তিনি বলেন, বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়াকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে, আর সার্ক সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম।

তিনি বলেন, ‘এ দুটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, বরং পরিপূরক সম্পর্ক থাকা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

সার্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পরামর্শক্রমে বাংলাদেশ পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি সুপরিকল্পিত কর্মপ্যাকেজ বিবেচনা করছে।

এর মধ্যে ঢাকায় অবস্থানরত সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা, কাঠমান্ডুর সার্ক সচিবালয়ের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে পরামর্শ, মন্ত্রী পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের সম্ভাবনা যাচাই এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে বিস্তৃত কূটনৈতিক যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘সার্ক এখন প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব, বাস্তবধর্মী সহযোগিতা এবং নবায়িত আস্থার অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশ সেই আস্থা গড়ে তুলতে অবদান রাখতে প্রস্তুত।’

বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা এবং সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজের বিশিষ্ট ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো রাষ্ট্রদূত তারিক এ. করিম।

আলোচক হিসেবে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস এবং সাবেক অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব মো. শামসুল হক।