বাসস
  ২৪ মে ২০২৬, ১৮:১২

দিনাজপুরে কোরবানির হাটে বেড়েছে গাড়লের চাহিদা, আশাবাদী খামারিরা  

ছবি : বাসস

রোস্তম আলী মন্ডল

দিনাজপুর, ২৪ মে ২০২৬(বাসস): আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে জেলার পশুর হাটগুলোতে গাড়লের চাহিদা বেড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে গাড়ল পালনের সুবিধা ও বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে জেলার অনেক তরুণই এখন গাড়ল পালনে মনোযোগী হয়েছেন। কোরবানির ঈদে তাদের সেই পরিশ্রম সফল হবে বলে আশা করছেন তারা।  

জেলার সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের খামারি মো. রেজাউল ইসলাম (৩৫) জানান, কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য তিনি ৪০ টি উন্নত জাতের গাড়ল প্রস্তুত করেছেন। তার খামারের প্রতিটি গাড়লের প্রায় ৫০ কেজি মাংস হবে। প্রতিটি গাড়ল ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দামে বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন। 

তিনি বলেন, ‘এবারে কোরবানির ঈদে আমার খামারের ৪০টি গাড়ল ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করি।’ 

রেজাউল জানান, এর মধ্যে কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য কয়েকজন পাইকার তার খামারে থাকা গাড়ল দেখে গেছেন। তারা ৪০টি গাড়লের দাম ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বলেছেন। খুব শীঘ্রই তার খামার থেকে পাইকারেরা উপযুক্ত মূল্য দিয়ে ৪০টি গাড়ল ক্রয় করে নিয়ে যাবেন বলে তার সাথে যোগাযোগ করছেন। 

ভেড়ার একটি উন্নত প্রজাতি ‘গাড়ল’। এগুলো দেখতে প্রায় ভেড়ার মতো। দেশি ভেড়ার চেয়ে এটি আকারে বড়, মাংসও বেশি হয়। গাড়লের লেজ লম্বা হয়। মাংসের চাহিদা মেটাতে দিনাজপুরে বেশ কয়েকটি গাড়লের খামার গড়ে উঠেছে। গাড়লের খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। অনেকে গাড়ল পালন করে নিজেদের ভাগ্য বদল করেছেন। স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক বেকার যুবক।

সারা দেশের মতো দিনাজপুরেও গাড়ল পালনে আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে যুব উদ্যোক্তারা গাড়ল পালনে সফলতা অর্জন করছে। জেলার ভেড়ার জায়গা এখন গাড়লের দখলে। গাড়ল পালনে খরচ কম, লাভ বেশি। 

পাশাপাশি এর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনাজপুরের খামারিদের মধ্যে গাড়ল পালনে মনোযোগী হতে দেখা যায়। 

মো. রেজাউল ইসলাম ২০১৮ সালের শেষ দিকে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি বিভাগের একজন শিক্ষকের পরামর্শে মাত্র ৪৫টি গাড়লের বাচ্চা নিয়ে খামার শুরু করেন।  দুই বছর পর লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন। এখন তার খামারে ২৩০টি গাড়ল রয়েছে। এর মধ্যে ৪০টি গাড়ল কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।  তার খামারে দুইজনের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

রেজাউল ইসলামের বাড়ির পাশে বিশাল টিকলির সরকারি চারণভুমি থেকেই গাড়লের খাদ্যের চাহিদা পুরণ হয়। বাড়তি কোনো খাদ্যোর প্রয়োজন হয় না। বছরে দুই বার ২ থেকে ৩টি করে বাচ্চা দিয়ে থাকে গাড়ল। 

গাড়ল মাচার উপর থাকতে পছন্দ করে। এরা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে পছন্দ করে না। মাচার উপর থাকায় গাড়লের বিষ্ঠা নীচে পড়ে যায়। গাড়লের বিষ্ঠা জৈব সার হিসাবে বিক্রি করা যায়।

খামারিরা মনে করেন, সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে আরও অনেকেই গাড়লের খামার তৈরিতে এগিয়ে আসবে। এতে মাংসের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে। 

রেজাউল ইসলাম মাত্র ৫০ হাজার টাকা মুলধন নিয়ে ৪৫টি গাড়লের বাচ্চা কিনে পালন শুরু করেন। এরপর থেকে আর পেছনে দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক সময় সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। এখন বার্ষিক ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। দুই বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে তার দুম্বা পালন করা পরিকল্পনা রয়েছে।

রেজাউল জানান, গাড়লের মাংস গন্ধমুক্ত সুস্বাদু। পুষ্টি গুণেও ভালো। দেশের দক্ষিনবঙ্গে এই মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতি কেজি মাংস ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

দিনাজপুরের আরেক গাড়ল খামারি নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘দিনাজপুর সদর উপজেলায় ৭ থেকে ৮ জন খামারি প্রায় ১০০০ গাড়ল পালন করছেন। তুলনামূলক গৃহপালিত অন্য প্রাণীর চেয়ে গাড়লের রোগ বালাই কম হয়। দ্রুত মাংস বৃদ্ধি হয়। গাড়লের মাংসে চর্বি কম থাকে। 

দিনাজপুর ভেটেরিনারী হাসপাতালের প্রধান পশু সার্জন ড.আশিকা আকবর তৃষা বলেন, জেলায় বেশ কয়েকটি গাড়ল খামার গড়ে উঠেছে। অনেকেই স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে এই গাড়ল পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। 

গাড়ল পালনে তেমন বাড়তি খরচ হয় না। গাড়ল তৃণভোজী প্রাণী। সবুজ ঘাস খেতে পছন্দ করে। চারণভ’মি থাকলে গাড়লের জন্য বাড়তি খাবারের প্রয়োজন হয় না। এই প্রাণীটির তেমন রোগ-বালাই হয় না। সহজ পদ্ধতিতে গাড়ল খামার গড়ে তুলে স্বল্প ব্যয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বি হওয়া সম্ভব।