বাসস
  ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:২৬

দিনাজপুরে ২০৫ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়া চিন্তামন ঘোড়া’র মেলা শুরু 

ছবি : বাসস

-রোস্তম আলী মন্ডল-

দিনাজপুর, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : জেলার ফুলবাড়ী উপজেলায় শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ২০৫ বছরের ‘বুড়া চিন্তামন ঘোড়া’র মেলা। 

আজ রোববার দুপুরে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার চিন্তামন নামক স্থানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহম্মেদ হাছান এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ মো. খুরশিদ আলম মতি এ ঘোড়া’র মেলার উদ্বোধন করেন। 

অনুষ্ঠানে উপজেলা বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।

আজ দুপুরে মেলা উদ্বোধনের পর বিকেল হতে মেলায় আগত ঘোড়াগুলো ক্রয় বিক্রয় শুরু হয়েছে। ঘোড়া বিক্রির জন্য আনুষ্ঠানিক ‘ছাপা’ (রশিদ) ইস্যু করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেচাকেনা শুরু হয়ে গেছে। ক্রেতা-বিক্রেতারা এখন আনুষ্ঠানিক লেনদেনের অপেক্ষায়। 

ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা ও চিন্তামন গ্রামে মেলাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠজুড়ে বসেছে জমজমাট গ্রামীণ ‘বুড়া চিন্তামন ঘোড়া’র মেলা। 

মেলায় বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, চরকি, পুতুল নাচ, যাদু প্রদর্শনী, গ্রামীণ খাবারের দোকান এবং ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজন মেলায় প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সব বয়সী মানুষের পাশাপাশি নারী দর্শনার্থীর উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।

প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ১৩ বৈশাখ থেকে শুরু হয়ে ১৫ দিন ধরে চলে এই ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার মেলা। গরু, মহিষ বা ছাগলের তুলনায় এখানে মূলত ঘোড়ার বেচা-কেনা বেশি হওয়ায় এটি ‘বুড়া চিন্তামন ঘোড়ার মেলা’ নামে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা—দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, বগুড়া ও ময়মনসিংহের চড় এলাকাসহ নানা প্রান্ত থেকে ৫ শতাধিক ঘোড়া নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ঘোড়া পালনকারীরা। তবে এবারে মেলায় বিপুল পরিমাণ ঘোড়ার সমাগম ঘটেছে। অনেকে এখনও শখের বশে হয়ে ঘোড়া লালন পালন করে থাকে। আবার গ্রামীণ ঐতিহ্য ঘোড়ার গাড়ি প্রচলন এখনো অনেক এলাকায় রয়েছে। এছাড়া ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাম এলাকার কাচা রাস্তায় মালামাল পরিবহনের কাজ করা হয়। এজন্য ঘোড়ার চাহিদা গ্রাম এলাকায় এখনো রয়েছে।

মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার হাসান আলী একটি ঘোড়ার দাম চেয়েছেন ৪ লাখ টাকা। যদিও ক্রেতারা ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্যদিকে জেলার বিরামপুর উপজেলা বিনাইল গ্রামের প্রবীণ ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী তার বংশ পরম্পরায় এই মেলায় প্রায় ৬০ বছর ধরে অংশ নিয়ে আসছেন। তিনি এবার একটি বাচ্চা মাদি ঘোড়া এনেছেন, যার দাম রেখেছেন ১৫ হাজার টাকা।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন ৫টি ঘোড়া এনেছেন, যার মধ্যে একটি বাচ্চাসহ মাদি ঘোড়ার দাম চাওয়া হচ্ছে ৭ লাখ ১ টাকা। তবে ক্রেতারা এখন পর্যন্ত তার প্রত্যাশিত মূল্য দিচ্ছেন না বলে জানান তিনি।

মেলার ইজারাদার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ফুলবাড়ী উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের সহযোগিতায় সুষ্ঠু ভাবে মেলা পরিচালিত হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবক দলও কাজ করে যাচ্ছেন।

ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. খুরশিদ আলম মতি জানান, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে এই ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার মেলা। এই মেলায় ঘোড়াসহ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া বিক্রি হয়ে থাকে। এছাড়া এই অঞ্চলের মানুষের প্রতিবছর নিত্য প্রয়োজনীয় কাঠের জিনিসপত্র এবং অন্যান্য প্রসাধনী জিনিসপত্র মেলায় ব্যাপক হারে বেচা-কেনা হয়। মেলাটি এই অঞ্চলের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উৎসবের একটি আমেজ বলে তিনি ব্যক্ত করেন।

ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিদর্শক মো. আব্দুল লতিফ শাহ বলেন, মেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। ১৫ দিনব্যাপী মেলায় পুলিশ সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান বাসস’কে জানান, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা ইজারা দেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী মেলাটি সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক তদারকি অব্যাহত থাকবে।