শিরোনাম

এনামুল হক এনা
পটুয়াখালী, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস): উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি জমিতে বোরো আবাদ সম্পন্ন হওয়ায় কৃষক ও কৃষি বিভাগের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতা, সেচ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ থাকা সত্ত্বেও এ বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বোরো ধানের আবাদে ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে।
আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিনে পটুয়াখালী সদর উপজেলা, দুমকি ও বাউফল উপজেলাসহ অন্যান্য উপজেলায় দেখা গেছে, মাঠ পর্যায়ে সন্তোষজনকভাবে ধান গাছের বৃদ্ধি হচ্ছে। এতে কৃষকেরা এবার ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী সদর, বাউফল, দুমকি, মির্জাগঞ্জ, গলাচিপা, দশমিনা, কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীসহ বিভিন্ন উপজেলায় এবার বোরো আবাদ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার ইটবাড়িয়া এলাকার কৃষক মো. হারুন মিয়ার সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এবার আমি ২ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছি। শুরুতে সেচ খরচ ও শ্রমিকের মজুরি নিয়ে কিছুটা চিন্তা ছিল। তবে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সময়মতো পরিচর্যার কারণে এখন জমির ধানের অবস্থা খুবই ভালো। যদি শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তাহলে গত বছরের তুলনায় ভালো ফলন হবে বলে আশা করছি।
দুমকি উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের কৃষক আবদুল মালেক হাওলাদার বলেন, আমাদের এলাকায় বোরো চাষে পানির প্রতিবন্ধকতা ও সেচ ব্যবস্থা একটি বড় বিষয়। তারপরও এবার উন্নত জাতের ধান রোপণ করেছি। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। গাছের বৃদ্ধি ভালো হওয়ায় এবার ফলন ভালো হবে।
মির্জাগঞ্জ উপজেলার মাধবখালী এলাকার কৃষক সেলিম খান বলেন, বোরো চাষে খরচ বেশি হলেও ফলন ভালো হয়। এবার এখন পর্যন্ত রোগবালাই তেমন দেখা যায়নি। কোনো দুর্যোগ না হলে ভালো পরিমাণে ধান ঘরে তুলতে পারবো।
বাউফল উপজেলার কৃষক রহিম গাজী বলেন, উপকূল এলাকায় বোরো আবাদে আগের চেয়ে আগ্রহ বাড়ছে। আমি এবার ৩ একরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ করেছি। ধানের গাছ দেখে মনে হচ্ছে ফলন ভালো হবে। ধানের ন্যায্যমূল্য পেলে আমরা কৃষকরা আরও উৎসাহিত হব বোরো আবাদে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে আরো জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কৃষকদের সঠিক জাত নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের মাঝে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণেও কৃষি বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এবং মৌসুমের শেষভাগে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে পটুয়াখালীতে চলতি মৌসুমে বোরো ধানে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কৃষকের আর্থিক স্বস্তি যেমন বাড়বে, তেমনি জেলার খাদ্য উৎপাদনেও ইতিবাচক অবদান রাখবে এ বোরো ফসল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আমানুল ইসলাম বাসসকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় বোরো ধান আবাদ হয়েছে ১৮ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার ৫০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম জমিতে চাষাবাদের কারণ অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ। আর জেলায় বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন।
তিনি বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আবাদ কিছুটা কম হলেও সার্বিকভাবে বোরো আবাদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। জেলার অধিকাংশ উপজেলায় ধানের গাছের বৃদ্ধি, কুশি গঠন এবং শীষ বের হওয়ার পর্যায় পর্যন্ত পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।’
ড. আমানুল ইসলাম আরো বলেন, ‘পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় জেলায় বোরো আবাদ সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জ। এখানে সেচ সুবিধা, জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব, শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়Ñএসব বিষয় কৃষকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তারপরও কৃষকদের আগ্রহ, সময়োপযোগী কৃষি পরামর্শ, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার এবং মাঠ পর্যায়ে নিবিড় তদারকির কারণে এবার বোরো আবাদে ভালো অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছি। সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো সেচ এবং আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতি অনুসরণ করলে এবার ফলন আরও ভালো হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
তিনি আরো বলেন, ‘কৃষি বিভাগ কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠ দিবস, উঠান বৈঠক ও সরাসরি পরামর্শ সেবা অব্যাহত রেখেছে। উপকূলীয় বাস্তবতায় কোন জমিতে কোন জাত ভালো হবে, কখন সেচ দিতে হবে, কীভাবে রোগ দমন করতে হবে- এসব বিষয়ে কৃষকদের হাতে-কলমে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। এ কারণে আমরা আশা করছি, চলতি মৌসুমে বোরো উৎপাদনে একটি ইতিবাচক সাফল্য আসবে।’