শিরোনাম

ঢাকা, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : মামলার জট কমানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের জন্য ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজলভ্য করতে আদালতের কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন করার উদ্যোগ জোরদার করছে সরকার। এর ফলে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল আদালত ব্যবস্থার দিকে এই অগ্রযাত্রা বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে আদালতের যোগাযোগের ধরনে নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের ধীরগতি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমবে বলেও মনে করেন তারা।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানান, এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ই-জামিন বন্ড ব্যবস্থাপনা, ই-ফ্যামিলি কোর্ট, অনলাইন কজ লিস্ট (কার্যতালিকা) এবং বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের ডিজিটালকরণসহ একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, দেশের নয়টি জেলায় ই-জামিন বন্ড ব্যবস্থাপনা চালু হওয়ায় আইনজীবী, কারা কর্তৃপক্ষ ও মামলাকারীদের সময় ও খরচ ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। এখন অনলাইনে জামিননামা জমা দেওয়া যাচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এই ব্যবস্থা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
একইভাবে, দু’টি জেলায় ই-ফ্যামিলি কোর্ট চালুর ফলে পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত মামলাসমূহ অনলাইনে দাখিল, শুনানি ও নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে। এতে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়েছে, খরচ কমেছে এবং আদালতে বারবার সশরীরে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনও কমেছে।
সাধারণ মানুষের জন্য অন্যতম বড় সুবিধা নিয়ে এসেছে অনলাইন কজ লিস্ট বা মামলার অনলাইন কার্যতালিকা। আগে মামলার তারিখ জানতে আদালতে যেতে হতো অথবা মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন বিচারপ্রার্থীরা ঘরে বসেই অনলাইনে তাদের মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারছেন।
তথ্য আদান-প্রদান আরও সহজ করতে সারা দেশের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র মামলা-সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া, অগ্রগতি জানা এবং শুনানির জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুতিতে বিচারপ্রার্থীদের সহায়তা করছে।
এ বিষয়ে সরকারের বৃহত্তর রূপকল্প তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং জনগণ সময়মতো ন্যায়বিচার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস (সিআরভিএস) উদ্যোগের অধীনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটালাইজেশন করা হলে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। ১০টি জেলার ১০২টি ইউনিয়নে এই কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে জালিয়াতি কমবে এবং নথিপত্রবিহীন বা তথ্য বিকৃতি থেকে উদ্ভূত বিরোধগুলো নিরসন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রস্তাবিত ‘ই-জুডিশিয়ারি’ প্রকল্প। এর মাধ্যমে মামলা দায়ের থেকে নথি সংরক্ষণ পর্যন্ত সব বিচারিক কার্যক্রম একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায় রয়েছে।
সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো এবং দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী বিচার নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
এই সংস্কারগুলোর আরেকটি লক্ষ্য হলো বিপুল সংখ্যক বিচারাধীন মামলার জট কমানো, যা দেশের দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, ধাপে ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে আদালতের ওপর চাপ কমবে এবং সময়মতো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ এখন সংস্কারের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে কার্যকর বাস্তবায়ন, অবকাঠামোগত সুবিধা থাকা এবং নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে জনগণের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর এই ডিজিটাল বিচারব্যবস্থার সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে।