বাসস
  ২৫ মার্চ ২০২৬, ১৬:৪৯

সুনামগঞ্জের ঐতিহাসিক  শিখা ‘সতেরো’

ছবি : বাসস

মুহাম্মদ আমিনুল হক

সুনামগঞ্জ, ২৫ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : মহান মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সারিতে থেকে বাংলার দামাল সন্তানরা অস্ত্র হাতে যুদ্বে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। মুক্ত করছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে এই দেশকে।

মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ ইতিহাস বই থেকে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর দেশকে হানাদারমুক্ত করার জন্য আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১৮ জন উদ্যমী যুবক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে একত্রিত হয়েছিলেন। সুনামগঞ্জের ছাতকের নোয়ারাই এলাকার সুরমা নদী হয়ে ভারতের চেলায় প্রশিক্ষণের জন্য রওনা দেন। নোয়ারাইয়ের বেতুরা এলাকা দিয়ে পথ অতিক্রমের সময় এই এলাকার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রাজাকার স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান মতছির আলী ওরফে ফকির চেয়ারম্যান এই খবর পেয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে কৌশলে যুবকদের তার বাড়িতে নিয়ে যায়। তার মিষ্টি কথায় সরল বিশ্বাসে যুবকরা প্রশিক্ষণে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু সেই সময় ফকির চেয়ারম্যান তাদের ভারত না নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে খবর দিয়ে এনে টগবগে যুবকদের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
যুবকরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের হাত-পা বেঁধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের ছাতক থানায় নিয়ে যায়। এ সময় ছাতক বাজারের বাসিন্দা জাফর আহমদ কাবেরী নামের এক যুবক পালাতে সক্ষম হন। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। ঐ দিন বেঁধে রেখে তাদের ওপর রাতভর অমানবিক নির্যাতন করা হয়।

পরের দিন সন্ধ্যায় ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের লালপুল নামকস্থানে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় কতিপয় লোক দিয়ে বড় একটি গর্ত খনন করা হয়। মুক্তিপাগল যুবকদের সেখানে নানাভাবে কষ্ট দিতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা। কষ্ট আর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তাদের কান্নার ভয়ংকর প্রতিধ্বনি। ভারি হয়ে উঠে এলাকার বাতাস। মূহুর্তের মধ্যে গর্জে উঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মেশিনগান। তাজা রক্তে রঙিন হয়ে উঠে লালপুল এলাকার সবুজ ঘাস।

গুলি করার পর টেনে হিঁচড়ে তাদের যখন গর্তের মধ্যে ফেলে দেয়া হয় তখনও অনেকের মৃত্যু নিশ্চিত হয়নি। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জীবন্ত ১৭ জন দামাল যুবককে নিমর্মভাবে মাটিচাপা দিয়ে নরপশুরা উল্লাসে মেতেছিল। পর দিন রাতে গ্রামের কিছু মানুষ এসে রক্তাক্ত দেহগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেন। সেই সাথে দেশের আরো ১৭ জন সূয

সুর্য সন্তানের এখানে জীবন্ত সমাধি রচিত হয়। যা আজ ছাতক তথা দেশের মানুষের কাছে ‘শিখা সতেরো’ নামে পরিচিত। তাঁদের এই আত্মত্যাগ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত করেছে।

কিন্তু, তাদের পরিচয় না জানাই ‘শিখা সতেরো’র রহস্যকে আরও গভীর করে তুলেছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যে এমন ভয়াবহ পরিকল্পনায় মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার স্বপ্নবাজ তরুণদের হত্যা করেছে তা বহু গবেষকের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, আমরা যদি ঐসব তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করি। তাহলে দেশজুড়ে মানুষ এই ১৭ অজানা বীরের আত্মত্যাগ থেকে অনুপ্রেরণা পাবে। নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতার প্রকৃত ইতহাস জানবে। কীভাবে রক্তে লেখা দেশ প্রেমিকদের নাম। অন্ধকারে ডুবে থাকা বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস মতছির আলী ওরফে ফকির চেয়ারম্যান ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর ছিল-একথা এলাকায় আজও প্রচলিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকেই বলেন, তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তার অপরাধের পুরো সত্য আজও অজানা। তিনি মৃত্যুবরণ করলেও রেখে গেছেন রক্তে লেখা বিশ্বাসঘাতকতার দাগ।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যেখানে বহু বীরের নাম জানা আছে, সেখানে এই ১৭ জন অচেনা যুবকের আত্মত্যাগ এক অনন্য ও হৃদয়বিদারক অধ্যায়। তাদের বীরত্ব, সাহস ও দেশপ্রেম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা ছাতক ভ্রমণে আসলে ‘শিখা সতেরো’ দেখে।

স্থানীয় শিক্ষকরা বলছেন এখানে একটি জাদুঘর, ফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ হলে ইতিহাস শিখতে আসা শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে।’
এলাকাবাসীর দাবি-রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই ছাতকের বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা জানান, রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শিখা সতেরো’কে জাতীয় স্মৃতিসৌধ হিসেবে ঘোষণা করা হোক।

‘যে ১৭ জন নিজেদের পরিচয় রেখে যেতে পারেননি, অন্তত রাষ্ট্র যেন তাদের একটি স্থায়ী ঠিকানা দেয়। স্বাধীনতার পর এর রহস্য কখনো উদঘাটিত হবে কি?’

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন বলেন, ছাতকের মানুষ আজও অপেক্ষা করে আছে এই ১৭ বীরের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার জন্য। গবেষকরা মনে করেন, হয়তো কোনোদিন কোনো দলিল, কোনো ব্যক্তিগত চিঠি, অথবা কোনো পরিবারের স্মৃতির টুকরো থেকে জানা যেতে পারে এই শহীদদের পরিচয়। যদি তাদের নাম-পরিচয় খুঁজে পাওয়া  যায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে। ‘শিখা সতেরো’ শুধু ছাতকের নয়; এটি বাংলাদেশের সংগ্রামী ইতিহাসের এক দুঃখগাঁথা। নাম না জানা ১৭ তরুণের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের পতাকা।  তাঁদের আত্মত্যাগ আজও আমাদের স্বাধীনতার শিখা, আমাদের শক্তি ও সাহস যোগায়।