বাসস
  ১৮ মার্চ ২০২৬, ১৮:০৪

চট্টগ্রামের রেলস্টেশন ও প্রবেশপথে ঘরমুখো মানুষের ঢল

ছবি : বাসস

চট্টগ্রাম, ১৮ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ছেড়ে প্রিয়জনের কাছে ফেরার আনন্দে এখন মুখর ঘরমুখো মানুষের ঢল। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও নগরের বিভিন্ন প্রবেশপথে বইছে এক অন্যরকম আবেগঘন জোয়ার।

ঈদকে ঘিরে সাত দিনের দীর্ঘ ছুটিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বস্তিদায়ক পরিবেশে বাড়ি ফিরছেন মানুষ। লম্বা এই ছুটি যেন ঈদের আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে তুলেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও স্বজন-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আশায় নগরী ছেড়ে নীড়ে ফিরছেন হাজারো মানুষ।

এবার ট্রেনের টিকিট পেতে তেমন কোনো বিড়ম্বনা না থাকায় এবং পরিবহনগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ কম থাকায় যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। ধাপে ধাপে নগরী ছাড়ার কারণে যাত্রাপথে চাপ থাকলেও তা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। ফলে প্রায় সবার চোখেমুখে আনন্দের ছটা।

এদিকে ঘরমুখো মানুষের স্রোতে চট্টগ্রাম নগরী অনেকটাই ফাঁকা হতে শুরু করেছে। ব্যস্ত সড়কগুলোতে নেই আগের চিরচেনা যানজটের দৃশ্য।

বুধবার (১৮ মার্চ) ভোর থেকেই চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ট্রেন ছেড়ে যাওয়ায় ভিড় থাকলেও যাত্রীদের মধ্যে উৎফুল্লতা বিরাজ করছে। আগের মতো হুড়োহুড়ি বা অস্বস্তির পরিবেশও তেমন দেখা যায়নি।

একই সময় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে নগরের প্রবেশপথ ও বাস টার্মিনালগুলোতেও ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১ মার্চ দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হতে পারে।

নগরের বহদ্দারহাট, নতুন ব্রিজ, কদমতলী আন্তঃজেলা বাস কাউন্টারসহ গরীবুল্লাহশাহ মাজার এলাকায় সকাল থেকেই ঘরমুখো যাত্রীদের ভিড় চোখে পড়ে। গরীবুল্লাহশাহ মাজারে দূরপাল্লার এসি বাস কাউন্টারগুলোতে আগেই ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে। যাত্রীরা নির্ধারিত সময়ে এসে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দিচ্ছেন।

তবে যাত্রীর চাপের তুলনায় বাস টার্মিনালে কিছুটা গাড়ির সংকট দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কাউন্টার মালিকরা জানান, যেসব গাড়ি ইতোমধ্যে ছেড়ে গেছে সেগুলো ফিরে এলে টিকিট সংকট কমে আসবে। বর্তমানে যাত্রীর তুলনায় গাড়ি কম রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) শেখ মো. সেলিম বলেন, “এখানে নিরাপত্তার কোনো শঙ্কা নেই। যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে পুলিশের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। যানজট নিরসন ও ভাড়া তদারকিতেও আমরা কাজ করছি।”

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত ৩ মার্চ থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হয়। ১৩ মার্চ থেকে অগ্রিম টিকিটধারী যাত্রীদের যাত্রা শুরু হয়েছে। যাত্রীসেবার কথা বিবেচনায় রেখে এবার শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রি করা হচ্ছে, ফলে ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে রেলস্টেশন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। টিকিট যাচাই শেষে যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, ফলে স্টেশনে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার বলেন, ‘ঈদযাত্রায় এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক রয়েছে। বুধবার সকাল থেকে যাত্রীদের চাপ আরও বেড়েছে। প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী-আরএনবি’র চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ আমান বলেন, ‘যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আরএনবি সজাগ রয়েছে। টিকিট দেখেই প্রবেশ করানো হচ্ছে। টিকিটবিহীন যাত্রী প্রবেশে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।’

নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সাব্বির হোসেন পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি সিলেটে যাওয়ার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। বাসের চেয়ে ট্রেনকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রামে ঈদ করার আনন্দই আলাদা। তাই যানজট ও ভোগান্তি এড়াতে আগেই রওনা দিয়েছি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আগেভাগেই বাড়ি যাচ্ছি।’

রাউজান উপজেলার নোয়াজিষপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, ‘সারা বছর ঢাকায় চাকরি করি। রমজানের শেষের দিকে কয়েক দিনের ছুটি পেয়ে গ্রামে চলে এসেছি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারা সত্যিই অনেক আনন্দের।’

একইভাবে ঢাকায় কর্মরত ফটিকছড়ির মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শহরের ব্যস্ততার মাঝে পরিবারকে খুব মিস করি। ছুটি পেলেই গ্রামে চলে আসি। এখানে এসে মনে হয় ঈদের আনন্দ আগেই শুরু হয়ে গেছে।’

আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সচিব মনোয়ার হোসেন জানান, ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে আন্তঃজেলার প্রায় ১ হাজার ২০০টি এসি ও নন-এসি বাস ছেড়ে যাচ্ছে। ১৬ মার্চ থেকে অগ্রিম টিকিটধারী যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে। এসব বাসে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে।

বহদ্দারহাটে আন্তঃজেলা বাস চালক করিম মিয়া বলেন, ‘রাস্তায় গাড়ির চাপ অনেক বেশি। কিন্তু যাত্রীদের মুখে বাড়ি ফেরার আনন্দ দেখলে আমাদের কষ্ট আর মনে থাকে না। আমরা চেষ্টা করছি সবাই যেন নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছাতে পারে। আমাদের ছুটি না থাকলেও মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়াটাই এক ধরনের তৃপ্তি।’

সব মিলিয়ে, এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক পরিবেশে এগিয়ে চলেছ—যেখানে প্রতিটি যাত্রাই প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন গল্প।