শিরোনাম

-মহিউদ্দিন সুমন-
টাঙ্গাইল, ৮ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : যে কোনো অনুষ্ঠানেই বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দ শাড়ি। এর মধ্যে আবার টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির প্রতি রয়েছে আলাদা টান। তাই ঈদ ও পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে ব্যস্ততার শেষ নেই টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়ির পল্লিগুলোতে।
এই দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে ডিজাইনে নতুনত্ব এসেছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িতে। আর সেই শাড়ি তৈরিতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন শ্রমিকরা। দুই উৎসবে দেড় লাখ পিস শাড়ি বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
ঈদুল ফিতর সামনে রেখে টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়িতে বরাবরের মতই এসেছে বৈচিত্র্য আর নতুনত্ব। দামের বিষয়টি মাথায় রেখে বাহারি রং ও ডিজাইনের শাড়ি বুনন করে তা বাজারজাত করছেন তাঁতিরা। শাড়িতে আঁচড় পড়েছে ঋতু পরিবর্তনের ছোঁয়াও। গুটি থেকে সুতা কাটা, কাপড় বুনুন, সুতায় রং লাগানো, শাড়িতে নকশা ফুটে তোলাসহ সব কাজেই এখন টাঙ্গাইলে ব্যস্ত কারিগররা। বিখ্যাত তাঁতপল্লির শোরুমগুলোতেও ভিড় বাড়ছে ক্রেতার।
সরেজমিনে জেলার দেলদুয়ার পাথরাইলে তাঁত শিল্প এলাকায় ঢুকতেই তাঁতের খটখটি শব্দ কানে ভেসে এল। উপজেলায় পাথরাইল, চণ্ডি, বাজিতপুর ও পুটিয়াজানির মত বিখ্যাত তাঁতপল্লিতে একদিকে চলছে বাহারি ডিজাইনের নিখুঁত শাড়ি বুনন। অপরদিকে চলছে শাড়ি বিক্রির ধুম। বহুমুখী ক্রেতার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁত শ্রমিকরা। সুতি, জামদানি, সফট সিল্ক, ধানসিঁড়ি, বালুচুরি, স্বর্নকাতান ও দোতারির মত নানা ডিজাইনের শাড়ি বুনছেন তারা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির রয়েছে ব্যাপক চাহিদা।
শাড়ি ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ ও বৈশাখকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইল শাড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির জন্যই টাঙ্গাইলের সুনাম বা পরিচিতি দেশের সীমা ছাড়িয়ে এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। আর সে কারণে তাঁত শিল্পীরা তাঁত শিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন টাঙ্গাইলের সফট সিল্ক ও কটন শাড়িতে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ঈদে ভালো ব্যবসার আশা করছেন তাঁত শাড়ির কুশিলব ও ব্যবসায়ীরা।
তাঁতপল্লির পাথরাইল, চণ্ডি, বাজিতপুর ও পুটিয়াজানি গ্রামেই এখন তাঁতের শাড়ি তৈরি হয়। এসব গ্রাম থেকেই সুতি, জামদানি, সফট সিল্ক, ধানসিঁড়ি, বালুচুরি, গ্যাসসিল্ক, স্বর্নকাতান, দোতারি, চোষা ও রেশম শাড়ির মত বাহারি ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করে সরবরাহ করা হচ্ছে সারাদেশে।
ব্যবসায়ীরা জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ি বুননের মূল কাজ একেবারেই আলাদা। অনেক পুরোনো একটা ঐতিহ্যের ধারায় চলে আসছে এ কাজ। সেই জ্ঞান ও নিষ্ঠা ছাড়া আসল টাঙ্গাইলের শাড়ি তৈরি করা সম্ভব না। আসল টাঙ্গাইলের শাড়ি তৈরির জন্য এর তাঁতি বা কারিগরদের শিল্পী হয়ে উঠতে হয়। টাঙ্গাইলে সেই শিল্পী তাঁতি আছেন। তাই টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প ও তাঁতের শাড়ির এতো সুখ্যাতি।
তাঁত শ্রমিকরা জানান, ঈদ ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আমাদের ব্যস্ততা বেড়েছে। ব্যস্ততা বাড়লেও বর্তমানে আমাদের মজুরি কম। একটি শাড়ি তৈরি করতে দুইদিন সময় লাগে। এতে মজুরি পাওয়া যায় ৭০০ টাকা। সপ্তাহে ৪টি শাড়ি তৈরি করতে পারি। এতো কম মজুরি দিয়ে আমাদের এখন সংসার চলে না।
তাঁত শ্রমিক আনোয়ার হোসেন জানান, ঈদে প্রতি বছর মহজনরা যে পরিমাণ শাড়ির ব্যবসা করে। সে তুলনায় আমরা শ্রমিকরা ন্যায্য মূল্য পাই না। এখন নতুন করে কেউ আর তাঁতের কাজ শেখে না। আমরা আগে যারা শিখেছি তারাই এখন এ কাজ করে যাচ্ছি। ভালো মজুরি না পাওয়ার কারণ অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। কারিগর সংকট হওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তাঁত শ্রমিক নারায়ন চন্দ্র বলেন, ২৪ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত আছি। বছরের পর বছর চলে যায় কিন্তু কারিগরদের মজুরি তেমন বাড়ে না। তাই হাতের তৈরি তাঁতের শাড়িকে টিকিয়ে রাখতে হলে সর্বপ্রথম শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরা টিকে থাকলেই তাঁত শিল্প টিকে থাকবে।
শাড়ি ডিজাইনার ও বিশিষ্ট শাড়ি ব্যবসায়ী নীল কমল বসাক বাসস’কে বলেন, ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের শাড়ির বুননশিল্প সম্প্রতি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। এ কারণে এবার ঈদে হস্তচালিত শাড়ি বুননের দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছেন তাঁত মালিকরা। ক্রেতাদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক বাসস’কে বলেন, এ বছর ঈদ ও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইল শাড়ির বিক্রি অনেক বেড়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। তবে মূলধন, প্রয়োজনীয় উপকরণের সমস্যা, দক্ষতার অভাব, বিপণনসহ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তাঁতি সম্প্রদায়। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে এবার দেড় লাখ পিস শাড়ি বিক্রি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।