শিরোনাম

মহিউদ্দিন সুমন
টাঙ্গাইল, ১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : প্রকৃতিতে বইছে এখন বসন্তের হাওয়া। সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে সূর্যমুখী ফুল। সকাল বেলা পূর্বদিকে তাকিয়ে থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের সঙ্গে ঘুরতে থাকে। সবুজের মাঝে চোখ জুড়ানো হলুদ রঙের ঝলকানি দেখে যে কারোই মন জুড়িয়ে যায়। সূর্যমুখী যেন সূর্যের দিকেই মুখ করে থাকে। এ যেন এক চিলতে মাঠে সূর্যমুখী ফুলের দোলাচল। এ চিত্র এখন টাঙ্গাইলের যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মাঠজুড়ে। সূর্যমুখী ফুলে হলুদ চাদরে ঢেকে দিয়েছে মাঠ।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় এ বছর সূর্যমুখীর অধিক ফলন হয়েছে। কম খরচে বেশি লাভ এবং তেলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় কৃষকের মুখে এখন সফলতার হাসি। মাটি ও আবহাওয়ায় অনুকূলে থাকায় এ মৌসুমে বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন সূর্যমুখী চাষিরা। সদর উপজেলা ছাড়াও জেলার ভূঞাপুর, গোপালপুর, নাগরপুর ও কালিহাতী উপজেলা চরাঞ্চলেও চাষ হচ্ছে এই সূর্যমুখী ফুলের।
সম্প্রতি সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নসহ যমুনার তীরবর্তী এলাকায় ক্ষেত পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, হলুদ আর সবুজের মিতালী ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে মাঠ। বাগানে উড়ছে মৌমাছি আর নানান রকম পাখি। শেষ বিকেলে মৌমাছিরা সূর্যমুখী ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। চোখ ও মন জুড়িয়ে যাওয়ার মতো এক অপরূপ দৃশ্য। এমন মুগ্ধতা ছড়ানো দৃশ্য দেখে কৃষকের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে হাসির ঝিলিক। সবুজ মাঠের মাঝখানে হলুদ রঙের সূর্যমুখী বাগানের এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছেন স্থানীয়রা।

সরকারি প্রণোদনার আওতায় এবং কৃষকদের আগ্রহে চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ গয়লা দুর্গম চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৫ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড জাতের টিএসএফ ২৭৫ জাতের তেলজাতীয় সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।
আবহাওয়া অনূকুলে থাকায় এ বছর সূর্যমুখীর ফলন বেশ ভালো হয়েছে। সবুজ পাতার আড়াল ভেদ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলগুলো যেন অভিবাদন জানাচ্ছে নতুন দিনকে। এ ছাড়া বর্তমানে আকাঁশ ছোয়া তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভোজ্য তেলের চাহিদাও পূরণ করবে আসছে সূর্যমুখী। তাই কম খরচে ভালো ফলন হওয়ায় দিন দিন সূর্যমুখী চাষে ব্যাপক আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। ফুলের বাগানে সারাদিন চলে মৌমাছি আর প্রজাপতির মেলা। এই নয়নজুড়ানো দৃশ্য কেবল কৃষকের স্বপ্নই নয়, বিনোদনপ্রেমীদের কাছেও হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ।
প্রান্তিক কৃষক আব্দুল মজিদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, আগে ভাবতাম সূর্যমুখী শুধু শৌখিন ফুল। কৃষি অফিসের স্যারদের কথামতো এবার ১ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছি। যে ফলন দেখছি, তাতে তেলের চাহিদা মিটিয়ে ভালো টাকা হাতে আসবে বলে আশা করছি।
সূর্যমুখী চাষি আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি গেল বছর সূর্যমুখী চাষ করে অন্যান্য ফসলের তুলনের কয়েকগুণ লাভ বেশি হওয়ায় চলতি মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে ৭ বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করছেন। এবার আরও বেশি লাভবান হবেন বলে প্রত্যাশা তার।
কৃষক হাতেম আলী বলেন, ধান বা পাটে অনেক পানি আর সার লাগে, খরচ পোষাতে হিমশিম খাই। কিন্তু সূর্যমুখীতে পানি কম লাগে, পোকাও কম ধরে। বাজারে এই তেলের অনেক চাহিদা, তাই আগামীতে আরও বড় পরিসরে করার ইচ্ছা আছে।

ঘুরতে আসা দর্শনার্থী কানিস ফাতেমা বলেন, ফেসবুকে ছবি দেখে যমুনার পাড়ে এসেছি। চারদিকে এত হলুদ ফুল দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। আগে জানতাম না এখানে এত সুন্দর সূর্যমুখীর চাষ হয়। যমুনার তীরে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের মানসিকভাবে খুব প্রশান্তি দিচ্ছে।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুমানা আক্তার বাসসকে জানান, সরিষার বিকল্প এবং স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে সূর্যমুখী চাষ এটি অধিক লাভজনক একটি তেলজাতীয় ফসল। দিন দিন টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে ব্যাপকহারে সূর্যমুখী চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সূর্যমুখী চাষীদের সকল ধরণের সহযোগীতা করে আসছে কৃষি বিভাগ।
তিনি আরো জানান, সূর্যমুখী চাষীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত মানের বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। সূর্যমুখী চাষ একদিকে যেমন ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি পর্যটনের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। সারা বছর টাঙ্গাইলে নানা ফসলের আবাদ হলেও, সূর্যমুখী এখন নতুন সম্ভাবনা। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ অব্যাহত থাকলে এটি জেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেবে।