শিরোনাম

ঢাকা, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে আজ যাত্রা শুরু করলেন তারেক রহমান।
তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান। ১৯৬৮ সালের ২০ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর একমাত্র ছোটোভাই ছিলেন আরাফাত রহমান কোকো। ফ্যাসিবাদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তিনি ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। ১৯৯৪ সালে তিনি সাবেক নৌবাহিনী প্রধান এবং সাবেক মন্ত্রী, রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারেক রহমানের সহধর্মিণী একজন কার্ডিওলজিস্ট। তারেক রহমান দম্পতি এক কন্যা সন্তানের জনক-জননী। তাদের একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা জারনাজ রহমান। তারেক রহমান এমন একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, যেই পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের পরিচয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। তারেক রহমানের পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরোত্তম ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে অস্ত্রহাতে লড়াই করেছেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান। ছিলেন দেশের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক। তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী। দেশ এবং জনগণের জন্য স্বৈরাচার এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার আপসহীন নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়াকে দেশের জনগণের কাছে অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত করেছে।
দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীকে পরিণত হওয়া জিয়া পরিবারের সন্তান তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় আচার আর রাজনৈতিক আবহের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন ছোট বেলা থেকেই। পরিবারটিই ছিল তারেক রহমানের প্রথম রাজনৈতিক পাঠশালা। একটি সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠলেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে সেই শৈশব-কৈশোর থেকেই তাকে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে।
শৈশবে মহান মুক্তিযুদ্ধ, কৈশোরে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবনে নানা আঘাত প্রতিঘাত পার করতে হয়েছে তারেক রহমানকে। সকল রকমের অপপ্রচার আর প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে বিনয়, সততা আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি জনগণের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।
তারেক রহমান একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। স্কুলে ছাত্র থাকা অবস্থায়ই নির্বিঘ্ন চলার পথে জীবনের প্রথম ছন্দপতন ঘটে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে পিতার মৃত্যু দেখেছেন। পিতার শাহাদাতের পর ওই সময়টিতে মা'-ই হয়ে ওঠেন তাদের দুই ভাইয়ের কাছে প্রধান আশ্রয়। মা খালেদা জিয়া তাদের দুই সন্তানকে মমতা দিয়ে আগলে রাখেন, যেমন আমৃত্যু আগলে রেখেছিলেন বাংলাদেশকে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা আর নানা পথ পরিক্রমায় বেগম খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্র এবং রাজনীতির হাল ধরতে হয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর গণতন্ত্রকামী জনগণের ইচ্ছায় বিএনপির হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া যখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির হাল ধরেন, তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গণআকাঙ্খাবিরোধী স্বৈরাচারী অপশক্তি। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া রাজপথের তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলেন।
দলের দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন। খালেদা জিয়া সারা দেশে যখন স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন, তারেক রহমান তখন স্কুল-কলেজ পর্ব পার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারেক রহমান প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশুনা করেন। তারেক রহমান যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল সারাদেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের ক্যাম্পাসগুলোতেও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।
পরিস্থিতিতে সামাল দিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন স্বৈরাচার বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আপস করার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। ফলে স্বৈরাচারের রোষানলে পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারেক রহমান। দেশের সকল শিক্ষার্থীকে স্বৈরাচারের রোষানলে রেখে খালেদা জিয়া নিজ সন্তানকে নিরাপদে বিদেশ পাঠিয়ে দিতে চাননি। খালেদা জিয়াকে ভয় দেখাতে স্বৈরাচারী সরকার তারেক রহমানের পেছনে গোয়েন্দা লেলিয়ে দেয়, এমনকি তাঁর উপর শারীরিক আক্রমণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে তারেক রহমানের জন্য অনিরাপদ করে তোলা হয়। এক পর্যায়ে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হলেও দেশ ছাড়েননি তারেক রহমান।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় স্বৈরাচারী সরকার প্রায়শ: খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী করে রাখতো। সেই উত্তাল দিনগুলোতে আন্দোলনকারী ছাত্র নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন তারেক রহমান। শেষ পর্যন্ত ৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। দেশে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সারা দেশে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন তারেক রহমান। এর আগে, ১৯৮৮ সালে নিজের পৈতৃক নিবাস বগুড়ার গাবতলী থানা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির রাজনীতিতে নাম খেলান। ৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয় লাভ করে। খালেদা জিয়া ৫টি আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে তারেক রহমান মায়ের সঙ্গে পাঁচটি নির্বাচনী আসনেই প্রচার প্রচারণায় সক্রিয় অংশ নেন। সেই সময় থেকেই মাঠের রাজনীতিতে তারেক রহমানের হাতেখড়ি। ৯১ সালে বিপুল ভোটে বিজয়ের পর খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। রাষ্ট্র পরিচালনায় জননন্দিত পিতাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখার পর ৯১ সালে মাকেও দেখলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবেও মাকে দেখেছেন। সেই সময় ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি অনাচারের বিরুদ্ধে তারেক রহমান রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর দক্ষতা, পরিকল্পনা এবং কৌশলী পরিচালনায় ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। দল পরিচালনায় সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। একই ধারাবাহিকতায় দলের কাউন্সিল অধিবেশনের মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দলের এইসব পদ-পদবি লাভের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন ধীরস্থির, শান্ত এবং দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি বিশ্বস্ত। তারেক রহমানের রাজনৈতিক দক্ষতা এবং কৌশল তাকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের টার্গেটে পরিণত করে। তখন থেকেই তার বিরুদ্ধে চলতে থাকে সীমাহীন মিথ্যাচার এবং অপপ্রচার।
২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলেও তারেক রহমান নিজে ব্যক্তিগতভাবে সরকারের অংশ হননি। তিনি বরং দলের একজন হয়ে সারা দেশের তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তিনি মনে করেন, তৃণমূল পর্যায়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয়, সচেতন এবং প্রশিক্ষিত নেতা থাকলে ওই দলকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না। একুশ শতকের গোড়ার দিকে ‘একটি উদ্যোগ একটু চেষ্টা, এনে দেবে সচ্ছলতা- দেশে আসবে স্বনির্ভরতা’- এই স্লোগান নিয়েই তিনি সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তৃণমূল জনগণের ক্ষমতায়ন এবং তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করার পদ্ধতি ও কৌশল নিয়ে ২০০৪ সালে তারেক রহমান দলের নেতা কর্মীদের অংশগ্রহণে শুরু করেন তৃণমূল সম্মেলন। দেশের ৬৪ জেলাকে সমন্বয়ের মাধ্যমে সারা দেশে ২০টি তৃণমূল সম্মেলন করেন। তাঁর এই উদ্যোগ রাজনীতিতে তাঁকে তৃণমূলের মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারেক রহমান বিশ্বাস করেন, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সংস্কারই টেকসই হবে না। তিনি মনে করেন, দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নীতি-কৌশলে জনগণের মতামতের প্রতিফলন জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। মা-বাবার মতোই তারেক রহমান মিতব্যয়ী, মিতভাষী। তিনি কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী। পিতার মতোই তিনি গ্রামবাংলার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে, মিশতে কিংবা তাদের সমস্যা সমাধানের সাথি হতে বেশী পছন্দ করেন।
রাজনৈতিক ঘটনা পরিক্রমায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এরপর থেকেই বিএনপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অপশক্তির তৎপরতা আরও জোরদার হয়। এরই অংশ হিসেবে অনিয়মতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক কথিত ওয়ান ইলেভেন সরকার ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে। তারেক রহমান চাইলে তথাকথিত ওয়ান ইলেভেনের আগে পরে দেশত্যাগ করতে পারতেন। তাঁর সামনে সেই প্রস্তাবও ছিল। দেশত্যাগের সুযোগ গ্রহণ না করে তিনি পরিস্থিতিকে আইনিভাবে মোকাবিলা করার পদক্ষেপকেই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি কারাবরণ করেছিলেন। ২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে কারাবন্দি অবস্থায়ই তারেক রহমানকে হত্যার অপচেষ্টা চালানো হয়। প্রায় ১৮ মাস কারাবরণের পর ২০০৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পান তারেক রহমান। কারামুক্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। এরপর লন্ডনে তাকে দীর্ঘ ১৮ বছর নির্বাসিত জীবন পার করতে হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে দেশ থেকে দূর প্রবাসে থাকলেও নিত্য, নিয়মিত তিনি দেশের জনগণের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছেন। সঠিক নির্দেশনা দিয়ে সারা দেশে দলের নেতা-কর্মী, সমর্থকদের নিয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন।
বিএনপির আন্দোলন দমন করতে ফ্যাসিবাদী সরকার নির্যাতন নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল। আন্দোলন দমন করতে ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’ বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিথ্যা অভিযোগে কারাবন্দি করা হয়। ফলে দলীয় সংবিধান অনুসারে তারেক রহমান একই দিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের দায়িত্ব নেন। রাজনীতিকে নিয়েছেন জনসেবা ব্রত হিসেবে। শত প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তিনি রাজনীতিতে একজন দক্ষ এবং কৌশলীই নয়, বরং দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অসংখ্য শহীদি প্রাণের বিনিময়ে যেই কোটা সংস্কার বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে, সেই আন্দোলনেরও বীজ বপন করেছিলেন তারেক রহমান।
২০১৮ সালে প্রথম দফায় সারা দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তারেক রহমানের হাত ধরেই কোটা সংস্কার ইস্যুটির বীজ রোপিত হয়েছিল। ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজের একটি অডিটোরিয়ামে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক সমাবেশে তারেক রহমান বলেছিলেন, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে সরকারি চাকরিতে কোটার হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে এই কোটা সংস্কার ইস্যু ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন গণ অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে।
কোটা সংস্কার ইস্যুতে ২০১৪ সালেই তারেক রহমানের বক্তব্য তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতাই প্রমাণ। তারেক রহমানকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে ফ্যাসিবাদী সরকার সকল প্রকার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। তিনি কখনোই চুপ থাকেননি। ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি ফ্যাসিবাদী সরকারের আদালত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভাষণ, বক্তব্য, বিবৃতি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের আগে পর্যন্ত দেশের গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার হয়নি। তবে তারেক রহমান কখনোই থেমে ছিলেন না। দেশ এবং জনগণের স্বার্থে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই তিনি আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন। সারা দেশের নেতাকর্মী, সমর্থকদের আন্দোলনে সক্রিয় রেখেছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ১৮ জুলাই আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধদেরকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে ফ্যাসিবাদী চক্র যখন আন্দোলন দমন করতে মরিয়া, তখন তারেক রহমান দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ এবং দলের নেতাকর্মী, সর্মথকদের উদ্দেশ্যে আওয়াজ তুলেছিলেন, দফা এক, দাবি এক শেখ হাসিনার পদত্যাগ। প্রায় সাড়ে নয় বছর পর ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট আদালত তারেক রহমানের বক্তৃতা বিবৃতির উপর তথাকথিত নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। তবে তার আগেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট চক্র দেশ ছেড়ে পালানোর পরই ফ্যাসিবাদী সরকারের আদালতের রায় জনগণের আদালতে অকার্যকর হয়ে পড়ে। দেশের গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য বিবৃতি প্রচারিত হতে শুরু করে। বাধামুক্ত পরিবেশে দেশের গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় তাঁর ঐতিহাসিক উক্তি, ‘বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়’। তার এই উদার এবং সাহসী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দেশ একটি অরাজক পরিস্থিতিতে থেকে বেঁচে যায়।
আদালতকে ব্যবহার করে কিংবা মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে তারেক রহমানকে দেশের জনগণ এবং দলের নেতাকর্মী সমর্থকদের কাছ থেকে দূরে রাখা যায়নি। বিদেশে ১৭ বছর ৩ মাস ১৩ দিন নির্বাসিত জীবন শেষে তারেক রহমান যখন ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেদিন এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়েছিল। লাখো, কোটি মানুষ তাকে হৃদয়ের সকল ভালোবাসা দিয়ে মাতৃভূমিতে বরণ করে নিয়েছিলেন। জানিয়েছে উষ্ণ অভিনন্দন।
দেশে ফিরেই তারেক রহমানও নগ্ন পায়ে গভীর আবেগে মাতৃভূমির মাটি স্পর্শ করেন। আল্লাহর দরবারে গভীর শুকরিয়া আদায় করেন। জনগণের মুখোমুখি হয়ে স্বাধীনতাপ্রিয়, গণতন্ত্রপ্রিয় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান'।
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে জনগণের সামনে তারেক রহমান নিজের গৃহীত প্ল্যান উপস্থাপন করেছেন।
জনগণ তাঁর পরিকল্পনায় সাড়া দিয়েছে, বিশ্বাস করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনে তারেক রহমান ২টি সংসদীয় আসনেই জয়লাভ করেন। তবে বর্তমানে তিনি বগুড়ার আসনটি ছেড়ে দিয়ে জাতীয় সংসদে ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তারেক রহমান ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বঙ্গভবনের চার দেয়াল পেরিয়ে, জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় জনগণের সামনে উন্মুক্ত মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ নিয়েছেন। সরকার গঠন করেছেন।