শিরোনাম

মুহাম্মদ আমিনুল হক
সুনামগঞ্জ, ৮ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে জেঁকে বসেছে শীত। কুয়াশা ও শিশিরে নষ্ট হচ্ছে বীজতলা (জালধান)। আজ বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলেনি। এমন কনকনে ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। এতে বোরো আবাদ মৌসুমে কৃষিকাজ মারাত্নকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অতি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। গ্রাম থেকে শহরের হাট-বাজার ও রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। কনকনে ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ।
সরেজমিনে আজ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, জমির বীজতলায় চারার পাতা পঁচে যাওয়ায় অনেক চারা মরে যাচ্ছে। যার কারণে বোরো মৌসুমে ধান রোপণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। এতে কৃষিকাজ মারাত্নকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, ভোরে কাজে বের হওয়া দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিকদের শীত বাড়তি কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে কাজ না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরেছেন।
সদর উপজেলার বড়ঘাট গ্রামের আব্দুল আলিম জানান, প্রচন্ড শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে বিভিন্ন এলাকায় জালধান (বীজতলা) নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাতের তীব্র ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে ধানের চারা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তিনি জানান, অনেক জমির বীজতলায় চারার পাতা পঁচে অনেক চারা মরে যাচ্ছে। যার কারণে বোরো মৌসুমে ধান রোপণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
পলাশ গ্রামের কৃষক আব্দুল আলী জানান, টানা শীতের কারণে ধানের বীজতলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও চারার রং হলদে বা সাদা হয়ে যাচ্ছে এবং কিছু চারা মারা যাচ্ছে। তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট গ্রামের কৃষক কুতুব মিয়া জানান, 'হঠাৎ করে এত শীত পড়ায় জালধান ঠিক ভাবে বাড়ছে না। চারার পাতা পঁচে যাচ্ছে। শীত যদি আরও বাড়ে, তাহলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে, এতে খরচও অনেক বেড়ে যাবে।'
উপজেলার বালিজুড়ি গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান জানান, 'রাতে কুয়াশা ও শিশিরে জালধান ভিজে থাকে। খড় ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছি, কিন্তু সব জমিতে তা করা সম্ভব হচ্ছে না।'
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জলিলপুর গ্রামের বাসচালক মিজান মিয়ার সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ঘনকুয়াশার কারণে গণপরিপহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া খুব একটা যাত্রীও পাওয়া যাচ্ছে না। রিকশাচালক সবুজ মিয়া বলেন, শীতের প্রকোপ বেড়েছে। তীব্র ঠান্ডায় রিকশা চালাতে পারি না। সন্ধ্যার পর ঠান্ডা আরও বেড়ে যায়। রিকশা চালিয়ে তেমন আয় না হওয়ায় সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে।
পৌর শহরের ওয়েজখালীর দিনমজুর ইকবাল হোসেন বলেন, আজ সকালে তীব্র ঠান্ডায় শহরে কাজের খোজেঁ আসছিলাম। কিন্তু, সকালে কোন মানুষ শহরে বের হননি। খালি হাতে বাড়ি ফিরছি। এমন অবস্থা থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে আমাদের মত নিম্ন আয়ের মানুষের।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের উপ সহকারী, আবহাওয়াবিদ রুদ্র তালুকদার বাসসকে জানান, আজ বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা ছিলো ১৭ ডিগ্রী। এমন তাপমাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি বিকেলেই ঘনকুয়াশায় আছন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, সারাদেশে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে রাতে শীত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ ছাড়া দেশের কোথাও কোথাও ঘন কুয়াশা পড়তে পারে বলেও সংস্থাটি আভাস দিয়েছে। আজ সকালে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।
এছাড়া মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আরো জানায়, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে দেশের অনেক জায়গায় শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে।
ছাতক উপজেলার বুরাইয়া গ্রামের শিক্ষক সালেহ আহমদ জানান, আমাদের গ্রামের মানুষও আজ রাত ও সকালে ভয়ে ছিলেন। কেউ এই তীব্র ঠান্ডায় বের হননি।
তাহিরপুর জয়নাল আবেদীন কলেজের রিমী রায় জানান, হাওর বেষ্টিত এলাকা তাহিরপুর। তাই প্রচন্ড ঠান্ডায় আমাদের দিনাতিপাত করতে হয়। শৈত প্রবাহের কারণে সকল প্রকার কাজ বন্ধ আছে। এমন কি স্কুল-কলেজে যেতেও ভয় হয়।
জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচালক ডা. মঈন উদ্দিন আলমগীর জানান, তীব্র শীতে হাওরপাড়ের বিভিন্ন বয়সের মানুষ ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছেন। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
ধর্মপাশা উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচালক ডা. সুবীর সরকার জানান, শৈতপ্রবাহের কারণে ঠান্ডা খুব বেশি। আর এমন ঠান্ডায় শিশু ও প্রবীণেরা নিউমনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছেন।
সিভিল সার্জন ডা. মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জেও শীতের প্রকোপ বেশি। যার কারণে ঠান্ডাজনিত রোগে শিশু ও প্রবীণেরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এই শীতে বিশেষ করে শিশু এবং প্রবীণদের গরম কাপড় পরিধান করতে হবে। তাহলেই শীতজনিত রোগ থেকে কিছুটা পরিত্রান পাওয়া যাবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বাসসকে বলেন, 'প্রচন্ড শীতে জালধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কৃষকদের রাতে পলিথিন বা খড় দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা, অতিরিক্ত পানি জমে থাকতে না দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করছে আমাদের লোকজন।' শৈতপ্রবাহের পূর্বেই বীজতলার লক্ষ্য মাত্রা ১০ হাজার হেক্টর পূরণ হয়ে গেছে।
এদিকে, জেলার প্রত্যেক উপজেলার কৃষকরা জালধান রক্ষায় কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।