শিরোনাম

মো. আসাদুজ্জামান
সাতক্ষীরা, ৮ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): জেলার বিস্তীর্ণ মাঠে যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই হলুদের সমারোহ। সরিষার হলুদ ফুলের মদির সুবাসে জুড়ে যায় প্রাণমন। মাঠের পর মাঠ চির সবুজের বুকে যেন কাঁচা হলুদের আলপনা। প্রকৃতি সেজেছে অপরূপ সৌন্দর্যের নান্দনিক রূপে। ফুলে ফুলে মৌমাছি মধু আহরণ করছে। সেই সাথে চলছে সরিষার ক্ষেত থেকে মধু আহরণ।
সাতক্ষীরায় সরিষা ক্ষেতে কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালন করে মধু উৎপাদন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহে বসানো হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মৌ-বক্স। এসব মৌ-বক্স থেকে ৭৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের সহযোগিতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই মধু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। যা সাতক্ষীরার স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘এ জেলার অন্যতম প্রধান একটি রবি ফসল হলো সরিষা। এই সরিষার ফুল থেকে মধু ও মোম সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। প্রতিটি মৌ-বক্স থেকে পাঁচ থেকে সাতবার মধু সংগ্রহ করা যায়। বর্তমানে প্রতি মণ সরিষা ফুলের মধু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকায়। ভ্রাম্যমাণ মৌচাষিরা সরিষা ছাড়াও বরই, লিচু ফুল ও সুন্দরবনের আশপাশে মৌ-বক্স বসিয়ে সারা বছর মধু সংগ্রহ করেন।
তিনি বলেন, মৌমাছি পালনের মাধ্যমে অনেক বেকার যুবক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। বর্তমানে ২৮ জন কৃষক প্রায় ১০ হাজার মৌ-বক্স স্থাপন করেছেন। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এবার ৭৫ মেট্রিক টন মধু উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ খাতে জেলায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে জেলায় ১৯ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছিল। ২০২৪ সালে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে জেলায় সরিষা চাষ হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৩১ হেক্টর জমিতে। ২০২৫ সালে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা সদর, তালা, কলারোয়া ও দেবহাটা উপজেলায় সরিষার আবাদ তুলনামূলক বেশি হয়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, আগের চেয়ে সরিষার আবাদ বেড়েছে। তাই মধু ও মোমের উৎপাদনও বাড়বে।
আশাশুনি উপজেলা বড়দল গ্রামের কৃষক আজগর আলী বাসসকে বলেন, আশ্বিন মাস থেকে সরিষা চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করা হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ৫ থেকে ৬ মণ সরিষা উৎপাদনে খরচ হয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। গত বছরের ১৭ টাকা কেজির সার এবার ৩০ টাকায় কিনেছেন বলে জানান তিনি। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চান কৃষকরা।
মৌচাষি আমিরুল গাজী জানান, সরিষা ক্ষেত থেকে বছরে তারা চার মাস মধু সংগ্রহ করে থাকেন। অন্য আট মাস কৃত্রিম পদ্ধতিতে চিনি খাইয়ে মৌমাছি লালন পালন করা হয়। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরিষা থেকে মধু সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। এসময় সর্বত্র সরিষার ফুল ফোঁটে।
তিনি বলেন, আকার ভেদে একটি বাক্সে ৩০ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। আমার সরিষা ক্ষেতে মৌ বাক্স রয়েছে ১০০টি। প্রতিটি বাক্সে খরচ হয় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। আর প্রতি কেজি মধু বিক্রি হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। প্রতি বাক্সে লাভ হয় ৪-৫ হাজার টাকার মতো। তিনি জানান, মধু চাষের ফলে সরিষার ফলন বৃদ্ধি পায় এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।
সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরীর মধু ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন জানান, বিসিক শিল্প নগরীতে তার মধু প্রক্রিয়াজাতকরণ মেশিনে নাম মাত্র মূল্যে মধু প্রক্রিয়াজাত করা হয়। মধু বিদেশে রপ্তানি করার জন্য ইতোমধ্যে তিনি বিদেশি ক্রেতাদের সাথে কথাও বলেছেন।
তিনি বলেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে সরিষা ফুলের মধু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
সাতক্ষীরা জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা দীপংকর দত্ত বলেন, ভেজাল শনাক্তে নিয়মিত অভিযান চলছে। মধুতে কেউ ভেজাল পণ্য মেশালে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।