বাসস
  ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৩৩

পশুখাদ্য সংকটে দুধ ও মাংস উৎপাদন হুমকিতে

উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মতো লালমনিরহাটেও ধানের খড়ের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে খামারিরা অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। ছবি : বাসস

।। বিপুল ইসলাম ।।

লালমনিরহাট, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার মতো লালমনিরহাটেও ধানের খড়ের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে কিছু কৃষক ও পাইকার লাভবান হলেও খামারিরা চরম অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। 

জেলার পশুপালন সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, খড়ের অতিরিক্ত খরচ দুধ ও মাংস উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক খামারি বর্তমানে গবাদিপশু বিক্রির কথাও ভাবছেন।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় খড়ের দাম ১০০ আঁটি ৭৫০ টাকা এবং ১ হাজার আঁটি ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। তবে এ দাম কিছু এলাকায় ভিন্নতা রয়েছে। খামারিরা আশঙ্কা করছেন, দাম শিগগির আঁটি প্রতি ৮ থেকে ৯ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ভুসি ও অন্যান্য পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় গবাদিপশু পালন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বাজারে গরু বিক্রি করলেও প্রত্যাশিত দাম মিলছে না।

সদরের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক ও খড় বিক্রেতা ইনুস আলি (৪৮) জানান, তিন বিঘা জমি থেকে তিনি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ আঁটি খড় সংগ্রহ করে পাইকারদের কাছে প্রতিটি ৬ টাকায় বিক্রি করেছেন। এতে তার আয়ের পরিমাণ হয়েছে ২১ হাজার ৬০০ টাকা।

গত বুধবার জেলা সদরের বড়বাড়ীর গরুর হাটে আদিতমারী উপজেলার খামারি আলতাব উদ্দিন (৫৪) জানান, খড় ও গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে গরু পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান দুধাল গাইয়ের জন্য প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ আঁটি খড় প্রয়োজন, কিন্তু কাঁচা ঘাসের সংকটে খড়ের ব্যবহার আরও বেড়ে গেছে। খরচ বাড়ায় লোকসান এড়াতে তিনি চারটি গরু হাটে এনেছেন।
একই হাটে গরু আনা খামারি ফয়েজ উদ্দিন (৪৬) বাসসকে বলেন, ২৫ কেজির ফিডের বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ৩৫ কেজির ভুষির দাম ১ হাজার ৬৫০ টাকা। প্রতিদিন গরুপ্রতি ফিড, ভুসি ও খড় ব্যবহার করতে গিয়ে গরু পালন আর সম্ভব হচ্ছে না।

জেলা সদরের বড়বাড়ী বাজারের খড় বিক্রেতা বাবলু মিয়া (৬০) জানান, ২০ আঁটি খড় ১৫০ টাকা ও ১০০ আঁটি ৭৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। খড় সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন খরচ যুক্ত হওয়ায় দাম বেশি। 

একই এলাকার খড় বিক্রেতা জাহাঙ্গীর (৪০) বাসসকে বলেন, মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে খড় কিনে মজুত রেখে দাম বাড়লে বিক্রি করে তিনি লাভবান হচ্ছেন।

অদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের কৃষক সালাম আলী (৫২) বাসসকে জানান, আগে যেখানে প্রতি আঁটি খড় ২ থেকে ৩ টাকায় মিলত, এখন তা ৭ থেকে ৮ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে গরু পালন দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিস্তা পাড়ের কৃষক আব্দুল ইসলাম (৬২) বলেন, গত কয়েক মৌসুম ধরে খড়ের সংকট বাড়ছে। আধুনিক যন্ত্রে ধান মাড়াইয়ে খড় ছোট হয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে খড় নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে দুধ ও মাংস উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কালিগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার ইউনিয়নের খামারি আফজাল হোসেন (৪০) ও আতিকুল ইসলাম (৫০) বাসসকে জানান, খড় ও অন্যান্য পশুখাদ্যের দাম বাড়তে থাকলে অনেক খামারি পশুপালন ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। এতে দুধ ও মাংসের সরবরাহ কমে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বাসসকে বলেন, খড়ের দাম বাড়ায় কৃষকরা লাভবান হলেও খামারিরা সমস্যায় পড়েছেন। সংকট মোকাবিলায় উন্নত জাতের ঘাস চাষ, সাইলেজ পদ্ধতিতে খড় সংরক্ষণ ও আধুনিক পশুখাদ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, খড়ের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও পশুখাদ্য সংকট নিরসনে সময়োপযোগী নীতিগত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।