শিরোনাম

শরীয়তপুর, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অবশেষে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন শরীয়তপুরের মনোহর বাজারের দক্ষিণ মধ্যপাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগমায়া মালো (৮৪)।
গতকাল সোমবার দুপুরে শরীয়তপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মধ্যপাড়া এলাকায় ছেলের ভাড়া বাসায় তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। এ বীরাঙ্গনা ক্যান্সারসহ বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।
পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শরীয়তপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায়ী শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বরূপ তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এরপর তার স্বজন ও তার পরিবারের সদস্যরা তাকে মধ্যপাড়ার শশ্মানে নিয়ে যান। সন্ধ্যার পর সেখানে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
যোগমায়া মালোর স্বজনরা জানান, দক্ষিণ মধ্যপাড়া গ্রামের মৃত নেপাল মালোর স্ত্রী যোগমায়া মালো। ১৯৭১ সালের ২২ মে মধ্যপাড়া গ্রামে গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা।
ঘটনার দিন যোগমায়া মালোর স্বজনদের হত্যা করা হয় এবং অন্য অনেক নারীর সঙ্গে কিশোরী যোগমায়া মালোকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মাদারীপুরের ক্যাম্পে। এরপর তাদের আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে যোগমায়া মালো অন্য মুক্তিযোদ্ধাসহ ফিরে আসেন নিজ গৃহে। যোগমায়ার স্বামী নেপাল মালো প্রায় ৭ মাস অপেক্ষার পর ফিরে পান প্রিয়তমা স্ত্রীকে।
কিন্তু স্বাধীনতার দুই বছর পর স্বামী নেপাল মালোও মারা যান। এরপর তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে শুরু করেন কষ্টের জীবন। দারিদ্র্য আর কষ্ট যোগমায়া মালোর পিছু ছাড়েনি। স্বাধীনতার পর নানান চাপে শ্বশুর আর স্বামীর ভিটেমাটি হারাতে হয়েছে তাকে।
তখন স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক শ্যামল রায়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার দুই ছেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও নানা জটিলতার কারণে নাম উঠেনি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়। বীরাঙ্গনা হিসেবে তালিকায় নাম তোলার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে যোগমায়াকে।
অবশেষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিকদের সহযোগিতায় ২০১৮ সালে বীরাঙ্গনার তালিকায় নাম ওঠে যোগমায়া মালোসহ আরও কয়েকজনের। পেতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। ভাতার টাকায় অসুস্থ যোগমায়ার চিকিৎসা ব্যয় চলছিল।
গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম যোগমায়া মালোর পরিবারকে একটি একতলা পাকা ভবন (বীর নিবাস) বুঝিয়ে দেন। ওই ভবনটিতে মৃত্যুর আগে এক রাত্রি কাটিয়েছিলেন যোগমায়া।
যোগমায়ার পুত্রবধূ ডলি রানী জানান, দীর্ঘদিন ধরে আমার শাশুড়ি অসুস্থ হয়ে শয্যাসায়ী। সর্বশেষ ৬ মাস আগে তার ক্যান্সার শনাক্ত হয়। কেমোথেরাপি চলছিল। এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে তিনি শেষ নি:স্বাস ত্যাগ করেন।